ক্যানসার চিকিৎসায় জোড়া অগ্রগতি, টিউমার নির্মূলের আশাও মিলছে মিনিটের ইনজেকশনে
ক্যানসার চিকিৎসায় বিশ্বজুড়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির খবর সামনে এসেছে। একদিকে ইংল্যান্ডে হাজারো ক্যানসার রোগীর জন্য চালু হচ্ছে দ্রুত প্রয়োগযোগ্য নতুন ইমিউনোথেরাপি ইনজেকশন।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক এক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে নতুন ধরনের একটি ইনজেকশনে রোগীদের টিউমার সম্পূর্ণ নির্মূল হওয়ার মতো ফল মিলেছে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইংল্যান্ডের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) পেমব্রোলিজুম্যাব নামের অত্যাধুনিক ইমিউনোথেরাপির নতুন ইনজেকশন সংস্করণ চালু করতে যাচ্ছে।
বর্তমানে এই ওষুধ স্যালাইনের মাধ্যমে শিরায় দিতে হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় একজন রোগীর প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। তবে নতুন ইনজেকশনটি দুই মিনিটেরও কম সময়ে প্রয়োগ করা সম্ভব।
পেমব্রোলিজুম্যাব পিডি-১ নামের একটি প্রোটিনকে বাধা দেয়, যা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর এক ধরনের ‘ব্রেক’ হিসেবে কাজ করে। ফলে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ক্যানসার কোষ শনাক্ত করে আক্রমণ করতে পারে।
এনএইচএসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এই চিকিৎসা নিচ্ছেন এমন প্রায় ১৪ হাজার রোগীর অধিকাংশই নতুন ইনজেকশন থেকে উপকৃত হবেন। এতে বছরে এক লাখ ঘণ্টারও বেশি চিকিৎসাসংক্রান্ত সময় সাশ্রয় হবে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
গত বছর নিভোলুম্যাব নামের আরেকটি দ্রুত প্রয়োগযোগ্য ইমিউনোথেরাপি ইনজেকশন চালু হয়েছিল, যা দিতে তিন থেকে পাঁচ মিনিট সময় লাগে। এখন এনএইচএসে প্রায় ৩০ ধরনের ক্যানসারের জন্য দুটি দ্রুতগতির ইমিউনোথেরাপি চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে।
এনএইচএসের জাতীয় ক্যানসার ক্লিনিক্যাল পরিচালক অধ্যাপক পিটার জনসন গার্ডিয়ানকে বলেন, এই ইমিউনোথেরাপি হাজারো রোগীর জন্য জীবনরেখা হিসেবে কাজ করছে। নতুন এই ইনজেকশনের ফলে রোগীদের আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাসপাতালে বসে থাকতে হবে না। তারা দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন।
এদিকে ১১টি দেশে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ‘অ্যামিভান্টাম্যাব’ নামের নতুন একটি ইনজেকশনেও আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে।
জনসন অ্যান্ড জনসনের তৈরি এই ইনজেকশন এমন রোগীদের দেওয়া হয়, যাদের ক্যানসার শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল বা আগের চিকিৎসায় কাজ হচ্ছিল না।
গার্ডিয়ান জানায়, মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত ১০২ জন রোগীর ওপর চালানো পরীক্ষায় দেখা গেছে, ৪৩ জনের টিউমার ছোট হয়েছে বা পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেছে। এর মধ্যে ১৫ জনের ক্ষেত্রে টিউমার সম্পূর্ণ নির্মূল হয়েছে। ফুসফুসের ক্যানসার রোগীদের মধ্যেও ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।
অ্যামিভান্টাম্যাব শিরার পরিবর্তে ত্বকের নিচে ইনজেকশন হিসেবে দেওয়া হয়। এটি তিনভাবে কাজ করে। প্রথমত, এটি ইজিএফআর প্রোটিনকে বাধা দেয়, যা টিউমার বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। দ্বিতীয়ত, এমইটি নামের একটি পথ বন্ধ করে দেয়, যেটি ব্যবহার করে ক্যানসার কোষ চিকিৎসা এড়িয়ে যায়। তৃতীয়ত, এটি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে।
প্রতি তিন সপ্তাহে একবার এই ইনজেকশন দিতে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল হালকা বা মাঝারি মাত্রার।
এই ট্রায়ালে অংশ নেওয়া জিহ্বার ক্যানসার রোগী কার্ল ওয়ালশ (৬৫) জানান, কেমোথেরাপি ও আগের ইমিউনোথেরাপি ব্যর্থ হওয়ার পর এই চিকিৎসায় তিনি উপকার পেয়েছেন। মাত্র দুই সাইকেল চিকিৎসার পরই তার ব্যথা ও ফোলা কমে গেছে এবং তিনি আবার স্বাভাবিক খাবার খেতে পারছেন।
গার্ডিয়ান জানায়, বর্তমানে প্রায় ৬০টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মাধ্যমে অ্যামিভান্টাম্যাবের কার্যকারিতা আরও বিস্তৃতভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে।