১৮ জেলায় অচল পড়ে আছে ৮০ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার তালিয়া গ্রামে দোতলা ভবনটি হঠাৎ দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই এটি আসলে ২০ শয্যার হাসপাতাল। প্রধান ফটকে বাইরে থেকে তালা ঝুলছে। সীমানা প্রাচীরের চারপাশে ঘিরে অবাধে বেড়ে উঠেছে ঝোপঝাড়।
সম্প্রতি ঘুরে হাসপাতালটির কয়েকটি জানালা খোলা দেখা যায়। তবে ভেতরে কাউকে দেখা যায়নি। ২০২০ সালে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণ করা হলেও কর্তৃপক্ষ এখনো সেখানে চিকিৎসাসেবা চালু করতে পারেনি।
তালিয়া হাসপাতালসহ ১৮টি জেলার অন্তত ৮০টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর—কোনো কোনোটি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অচল পড়ে আছে। জনবল সংকট, যন্ত্রপাতির অভাব ও প্রশাসনিক জটিলতায় এসব প্রতিষ্ঠান চালু হয়নি। ফলে নিজ এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে হাজারো মানুষ।
এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ১৭টি হাসপাতাল, এর মধ্যে চারটি শিশু হাসপাতাল; ১৪টি কমিউনিটি ক্লিনিক ও বিদ্যমান হাসপাতালের ১২টি সম্প্রসারিত ভবন। এর বাইরে রয়েছে স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসন ও অন্যান্য অবকাঠামো।
দ্য ডেইলি স্টারের হাতে আসা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নথি অনুসারে, এসব স্থাপনা চালু না হওয়ার কারণ মূলত জনবল, যন্ত্রপাতি ও ওষুধ সংকট।
চিকিৎসক ও সেবিকাদের আবাসন হিসেবে কিছু ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলো সীমিত পরিসরে পরিচালিত হওয়ায় সেগুলোও ব্যবহৃত হচ্ছে না।
নথি অনুসারে, ৪১টি স্থাপনার নির্মাণকাজ ২০২৪ সালে শেষ হয়েছে। বাকি স্থাপনাগুলো তারও আগে—কিছু কিছু স্থাপনার বয়স এক দশকেরও বেশি।
অব্যবহৃত পড়ে থাকা হাসপাতাল
তালিয়া হাসপাতাল নির্মাণে দুই একর জমি দান করেছিল স্থানীয় বাসিন্দা মুক্তার হোসেনের পরিবার। ২০২১ সালে ভবনটি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বুঝে পায়। আশেপাশের চারটি গ্রামের বাসিন্দাদেরও এই হাসপাতাল থেকে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার কথা ছিল।
'জমি দিয়ে কী লাভ হলো! হাসপাতাল হয়েছে, কিন্তু চালু হয়নি। মানুষ চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে না,' আক্ষেপের সুরে বলেন মুক্তার।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গাজীপুরের সিভিল সার্জন মামুনুর রহমান বলেন, 'কর্তৃপক্ষ এখনো জনবল নিয়োগ দেয়নি, এমনকি ওষুধের বরাদ্দও নেই।'
নথিতেই রয়েছে রংপুর শহরে প্রায় ছয় বছর ধরে অব্যবহৃত পড়ে আছে ১০০ শয্যার শিশু হাসপাতাল। জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে এক দশমিক ৬৫ একর জমির ওপর নির্মিত হাসপাতালটি চালু হয়নি। ৩১ কোটি আট হাজার টাকা ব্যয়ে ২০১৯ সালের নভেম্বরে নির্মিত তিনতলা ভবনটি পরের বছরের মার্চে সিভিল সার্জন কার্যালয় বুঝে পায়।
যোগাযোগ করা হলে রংপুরের সিভিল সার্জন শাহীন সুলতানা জানান, হাসপাতালের জন্য চিকিৎসক-সেবিকা নিয়োগ এবং যন্ত্রপাতির জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে, কিন্তু ফল হয়নি।
অন্যান্য জেলাগুলোতেও একই চিত্র দেখা গেছে। পঞ্চগড়, নেত্রকোণা, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, সিলেট, মেহেরপুর ও নরসিংদী—এই সাত জেলার সদর হাসপাতালগুলো ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হলেও ভবনগুলো অব্যবহৃত পড়ে আছে।
ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় আহতদের চিকিৎসায় মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় ২০২২ সালের নভেম্বরে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ট্রমা সেন্টার নির্মাণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একজন জানান, স্বাস্থ্যকর্মীদের পদ সৃষ্টি না হওয়ায় তিনতলা ভবনটি এখনো চালু হয়নি।
সম্প্রতি ট্রমা সেন্টার পরিদর্শন করে দেখা গেছে, কন্ট্রোল রুম থেকে বৈদ্যুতিক সকেট ও যন্ত্রপাতি খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
যোগাযোগ করা হলে মাদারীপুরের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন সরদার মোহাম্মদ খলিলুজ্জামান এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সাভারে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণে ২০২৩ সালে সরকার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ ম্যানেজমেন্টের (বিআইএইচএম) জন্য চারটি ভবন নির্মাণ করে। এর মধ্যে একটি ১২তলা ভবন। তবে প্রতিষ্ঠানটির জনবল কাঠামো (অর্গানোগ্রাম) চূড়ান্ত না হওয়ায় চালু হয়নি।
'অব্যবহৃত কিছু স্থাপনা যত দ্রুত সম্ভব চালু করার চেষ্টা করা হচ্ছে'—যোগাযোগ করা হলে বলেন স্বাস্থ্য সচিব সাইদুর রহমান।
গত ৬ জানুয়ারি তিনি ডেইলি স্টারকে আরও বলেছিলেন, 'অব্যবহৃত শিশু হাসপাতাল, কয়েকটি সদর হাসপাতালের সম্প্রসারিত ভবন ও ট্রমা সেন্টার চালু করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।'
সরকার আপাতত সদর হাসপাতালের শিশু বিভাগ থেকে চারটি শিশু হাসপাতালে যন্ত্রপাতি স্থানান্তর ও জনবল পদায়নের পরিকল্পনা করছে।
বিআইএইচএম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ কার্যকর করার প্রক্রিয়া শেষ হতে দুই থেকে তিন বছর সময় লাগবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিছু স্থাপনা সেবা দেওয়ার উপযোগী নয়। কারণ কোনো ধরনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই সেগুলো নির্মাণ করা হয়েছে।
'কোনো কোনোটি চালু করতে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে সম্পৃক্ত করারও চেষ্টা চলছে,' যোগ করেন তিনি।
[এই প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করতে দ্য ডেইলি স্টারের সাভার, গাজীপুর, শরীয়তপুর ও লালমনিরহাটের সংবাদদাতা তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন]