আদ-দ্বীনে ৬ শিশুর মৃত্যু: যমজ ছেলের নামও রাখতে পারেননি মা-বাবা
পৃথিবীতে আসার চার দিন পর গত ২৭ মে রাজধানীর আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার কথা ছিল মোহাম্মদ হাসান সরদারের যমজ দুই ছেলের।
নবজাতকের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই কেনা হয়ে গিয়েছিল। বাকি ছিল শুধু—দুই যমজ ভাইয়ের নাম রাখা।
কিন্তু বাড়ি ফেরার আগেই মারা যায় দুজন।
২৭ মে ভোরে হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষে অসুস্থ হয়ে পড়া এবং পরে মারা যাওয়া ছয় নবজাতকের মধ্যে ছিল হাসানের এই যমজ সন্তানরাও।
ঢাকার নন্দীপাড়ার বাসিন্দা মাছ ব্যবসায়ী হাসান জানান, তার স্ত্রী তাকে জানিয়েছিলেন যে রাত ২টার পর থেকে কক্ষটির পরিবেশ অস্বাভাবিকভাবে গরম ও দমবন্ধকর হয়ে উঠেছিল।
আজ রোববার দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘রুমের ভেতরে প্রচণ্ড গরম আর দমবন্ধ হয়ে আসার মতো মনে হচ্ছিল। পরিবেশটা একদমই স্বাভাবিক মনে হয়নি। একটা অদ্ভুত গন্ধও নাকে আসছিল, যেটাকে কেউ কেউ মেডিকেল গ্যাসের গন্ধ বলে মনে করেছিলেন।’
হাসানের ভাষ্যে, এর কিছুক্ষণ পরই শিশুরা কান্না ও বমি করতে থাকে এবং শারীরিকভাবে কষ্ট পেতে শুরু করে।
তিনি বলেন, ‘বমির পর বাচ্চাগুলো খিঁচুনির মতো কাঁপতে এবং ছটফট করতে শুরু করে। প্রায় সবার অবস্থাই একই রকম ছিল।’
হাসানের অভিযোগ, শিশুদের অবস্থার অবনতি শুরু হওয়ার সময় ওই কক্ষে কোনো চিকিৎসক বা নার্স উপস্থিত ছিলেন না।
তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রী ও অন্যরা ডাক্তার-নার্সদের খুঁজেছেন, কিন্তু কাউকে পাননি। সেখানে শুধু একজন আয়া ছিলেন।’
তার যমজ সন্তানদের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) নেওয়া সময় অবস্থা ইতোমধ্যে সংকটাপন্ন হয়ে গিয়েছিল বলে দাবি করেন হাসান।
‘বারবার বমির কারণে তাদের শরীর নীলচে হয়ে গিয়েছিল। সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হলে হয়তো আমার ছেলেরা আজ বেঁচে থাকত,’ বলেন এ বাবা।
ঘটনার সময় পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষে উপস্থিত থাকা হাসানের বোন রাবেয়া বেগমও একই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘অনেক ডাকাডাকির পর একজন নার্স আসেন এবং অন্য একটি শিশুকে এনআইসিইউতে নিয়ে যান।’
আজ ফোনকলে রাবেয়া বলেন, ‘আমি একজন আয়ার সঙ্গে আমাদের বাচ্চাদের ভোর সাড়ে ৪টার দিকে এনআইসিইউর দিকে নিয়ে যাই। কিন্তু তাদের ভর্তি করানো সম্ভব হয় সকাল ৬টার দিকে। সকাল ৯টার পর দুজনই মারা যায়।’
দায়ীদের জবাবদিহিতা দাবি করে হাসান বলেন, ‘আমি এ ঘটনার সঠিক তদন্ত ও বিচার চাই। আমার ছেলেদের আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু যারা দায়ী তাদের চিহ্নিত করে শাস্তি দিতে হবে।’
সরকারি তদন্ত কমিটির সদস্যরা আজ বাসায় এসে গিয়ে তার ও তার স্ত্রীর বক্তব্য রেকর্ড করেছেন বলেও জানান হাসান।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে হাসপাতাল পরিচালনাকারী আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের মানবসম্পদ ও কোম্পানি বিষয়ক পরিচালক তরিকুল ইসলাম মুকুল অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, ‘এটা সত্য যে ওই নির্দিষ্ট পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষে কোনো চিকিৎসক দায়িত্বে ছিলেন না। তবে পাশের ইউনিটে একজন চিকিৎসক ছিলেন। কোনো হাসপাতালই পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষে আলাদা করে কোনো চিকিৎসক দায়িত্বে থাকে না।’
‘তবে সেখানে একজন নার্স উপস্থিত ছিলেন,’ বলেন তিনি।
শিশুদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ার পর ব্যবস্থা নিতে দেরি হওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালের কর্মীরা নবজাতকদের এনআইসিইউতে স্থানান্তর করেন।
পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষ পরিচালনার জন্য হাসপাতালের নিজস্ব প্রটোকল রয়েছে দাবি করে আজ ডেইলি স্টারকে তরিকুল বলেন, ‘তবে কোথাও একটা ভুল হয়তো হয়েছে। এই ঘটনা থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার ও সংশোধন করার আছে।’



