বিশ্ব কিডনি দিবস

দুর্ভোগের আরেক নাম যখন ডায়ালাইসিস

কিডনি রোগী আছে এমন ৯২ শতাংশ পরিবার আর্থিক সংকটে; প্রতি বছর বাড়ছে রোগীর সংখ্যা।
তুহিন শুভ্র অধিকারী
তুহিন শুভ্র অধিকারী

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার বাসিন্দা শাহাবুদ্দিন অটোরিকশা চালিয়ে তার তিন সদস্যের পরিবার চালাতেন। তার বয়স ৪৫ বছর। চার বছর আগে তার স্ট্রোক হয় এবং দুই বছর পর ডেঙ্গুতে ভোগেন। এরপর গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তার চোখে সমস্যা দেখা দেয়।

গোপালগঞ্জের একটি হাসপাতালে ছয় মাস চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি আবারও অটোরিকশা চালাতে শুরু করেন। কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যেই এক দিন হঠাৎ তার শরীর ফুলতে শুরু করে। সেদিনই তাকে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। যেখানে পরীক্ষায় কিডনির সমস্যা ধরা পড়ে।

গত ছয় মাসে শাহাবুদ্দিনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে হাসপাতালে। ফরিদপুর ও ঢাকার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে তিনি ডায়ালাইসিস নিচ্ছেন। চিকিৎসার খরচ জোগাতে ইতোমধ্যে তার স্ত্রীর গয়না, নিজের রিকশা ও গাছ বিক্রি করেছেন। তারপরও আত্মীয় স্বজন ও গ্রামবাসীর কাছ থেকেও সহায়তা নিতে হয়েছে।

‘আমাদের যা ছিল সব শেষ হয়ে গেছে। বিক্রি করার মতো জমিও নেই…কীভাবে তার চিকিৎসা চালাবো বুঝতে পারছি না…,’ উদ্বেগ ও হতাশা নিয়ে বলেন শাহাবুদ্দিনের স্ত্রী খাদিজা বেগম।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে হাসপাতালের ওয়েটিং রুমে দ্য ডেইলি স্টারের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে যখন খাদিজার কথা হয়, তখন জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটে (এনআইকেডিউ) তার স্বামীর ডায়ালাইসিস চলছিল।

কিডনি রোগের ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন শাহাবুদ্দিনের মতো আরও অনেক পরিবার।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) ২০২৪ সালে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে ডায়ালাইসিসের খরচ জোগাতে গিয়ে কিডনি রোগীদের ৯২ শতাংশ পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে।

ওই বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিত গবেষণাপত্র থেকে জানা যায় ডায়ালাইসিসের রোগীদের গড়ে মাসিক ব্যয় ৪৬ হাজার ৪২৬ টাকা। এই ব্যয় সর্বনিম্ন ৬ হাজার ৬৯০ থেকে সর্বোচ্চ ব্যয় ২ লাখ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ডায়ালাইসিসের খরচ জোগাতে প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবার আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এছাড়া প্রায় ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ রোগী প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেশনে ডায়ালাইসিস নিতে পারেন না।
হাসপাতালভিত্তিক গবেষণায় ওই সময় চিকিৎসাধীন মোট ৪৭৭ জনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়, যারা সরকারি, বেসরকারি ও এনজিও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ভর্তি ছিলেন।

দেশে প্রায় ৩৫টি সরকারি হাসপাতালে তুলনামূলক কম খরচে কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা দেওয়া হয়, যেখানে একই সেবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অনেক বেশি ব্যয়বহুল। এছাড়া বেশিরভাগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামের অনেক রোগী স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হন।

দেশে মোট কিডনি রোগীর সংখ্যা কত—সে ব্যাপারে সরকারের কাছে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। তবে দেশের বৃহত্তম সরকারি কিডনি হাসপাতালের তথ্য বলছে, কিডনি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

চলতি মাসের শুরুতে প্রকাশিত হেলথ বুলেটিন ২০২৪ অনুযায়ী, ওই বছর এনআইকেডিউতে মোট ২ লাখ ৬ হাজার রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন, আগের বছরে যা ছিল ১ লাখ ৯০ হাজার। অর্থাৎ এক বছরে রোগী বেড়েছে ৮ দশমিক ৪২ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটিতে ৫০০টি শয্যা রয়েছে।

২০২২ সালে রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭৮ হাজার।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে আগামীকাল (প্রতি বছর মার্চ মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার) ‘সবার জন্য কিডনি স্বাস্থ্য—মানুষের যত্ন, পৃথিবীর সুরক্ষা’ প্রতিপাদ্য নিয়ে বিশ্ব কিডনি দিবস পালন করা হবে।

যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যসচিব ফারহাদ হাসান চৌধুরী গতকাল সন্ধ্যায় ডেইলি স্টারকে বলেন, কিডনি রোগের চিকিৎসা—বিশেষ করে ডায়ালাইসিস ব্যয়বহুল হওয়ায় প্রতিরোধের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘কিডনি কীভাবে সুস্থ রাখা যায় এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর আমরা জোর দিচ্ছি।’
‘যদিও সরকার ডায়ালাইসিস সেবা বাড়াতে কাজ করছে, তবে দীর্ঘ মেয়াদে এটি সর্বোত্তম সমাধান না। বরং মৃতদেহ থেকে কিডনি প্রতিস্থাপন একটি ভালো বিকল্প হতে পারে।’

‘শেষ উপায় হিসেবে কানের দুল বিক্রি করেছি’

খাদিজা বেগম জানান, গত বছরের অক্টোবরের দিকে শাহাবুদ্দিনকে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সে সময় হাসপাতালে ১২ দিন থাকতে হয়, খরচ হয়েছিল প্রায় ২০ হাজার টাকা। গ্রামবাসী সেই টাকা জোগাড় করেছিলেন।

‘ডাক্তার তিনটি ইনজেকশন দিতে বলেন, যার একেকটির দাম ১১ হাজার টাকা। আমরা কিনতে পারিনি। চার দিন বাড়িতে থাকার পর তিনি আবার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফের ১২ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়। আত্মীয়রা টাকা দিয়ে সহায়তা করেছিল। এরপরও চিকিৎসার খরচ মেটাতে ৪০ হাজার টাকার গাছ বিক্রি করতে হয়।’

পরবর্তীতে শাহাবুদ্দিনের পরিবার অন্য চিকিৎসক দেখিয়ে বাড়িতে ওষুধ চালিয়ে যায়। তবে শাহাবুদ্দিনের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। গত ১০ ফেব্রুয়ারি অবস্থার অবনতি হলে তাকে আবার একই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

খাদিজা বলেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিন চিকিৎসকরা ডায়ালাইসিসের পরামর্শ দেন। কিন্তু সেদিন ওই হাসপাতালের ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধ ছিল। পরে ফরিদপুর শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ১৭ হাজার টাকা খরচ করে ডায়ালাইসিস করাতে হয়।’

ডায়ালাইসিস শেষে তারা আবার জেনারেল হাসপাতালে ফিরে যান, যেখানে প্রতি সেশনের ডায়ালাইসিস খরচ ৪২০ টাকা। ‘কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসক সপ্তাহে দুইবার ডায়ালাইসিস করার পরামর্শ দিয়ে ছাড়পত্র দেন। হাসপাতালের বাইরে প্রতিটি সেশনে প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা লাগে, আর যাতায়াতে খরচ হয় আরও দেড় হাজার টাকা।’

পরে আরও চার বার ডায়ালাইসিসের জন্য শাহাবুদ্দিনকে হাসপাতালে নিতে হয়। বাধ্য হয়ে অটোরিকশাটি ২৬ হাজার টাকা বিক্রি করে দেন তারা।

এরপর চিকিৎসক তার হাতে স্থায়ী ডায়ালাইসিস সংযোগ (ফিস্টুলা) বসানোর পরামর্শ দেন। ফরিদপুর হাসপাতালে এটি সম্ভব ছিল না। তাই শাহাবুদ্দিনের পরিবার গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় আসে।

‘কিন্তু তার হাত ফুলে থাকায় ফিস্টুলা বসানো যায়নি। আবার হাসপাতাল ভর্তিও নিতে চায়নি। অনেক অনুরোধ-কান্নাকাটির পরও এনআইকেডিউ হাসপাতালে তাকে ভর্তি করানো যায়নি।’

শাহাবুদ্দিন এখন বহির্বিভাগের রোগী হিসেবে প্রতি সেশনে ৩ হাজার ৪০০ টাকা খরচ করে ডায়ালাইসিস নিচ্ছেন। ‘কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের জন্য এ খরচ মাত্র ৬০০ টাকা…।’

এনআইকেডিউতে ডায়ালাইসিস সেবা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারত্বের ভিত্তিতে একটি ভারতীয় কোম্পানি পরিচালনা করছে।

খাদিজা বলেন, ‘চিকিৎসা চালিয়ে যেতে শেষ উপায় হিসেবে আমি ২৬ হাজার টাকায় আমার কানের দুল বিক্রি করেছি।’

তিনি জানান, ফিস্টুলা করার জন্য তার হাত স্বাভাবিক করতে আরও তিনটি ডায়ালাইসিস প্রয়োজন। ‘এরপর আমরা ফরিদপুর হাসপাতালে ফিরে যাব।’

‘আমার এক ননদ আগে কিডনি রোগে মারা গেছেন। তাই অনেকেই মনে করেন, আমার স্বামীকে বাঁচানো যাবে না। তারা সাহায্য করতে অনীহা দেখান। কিন্তু স্ত্রী হিসেবে আমি তো আর তাকে এভাবে কষ্ট পেতে দেখতে পারি না। তাই আমি যা পারছি, সব চেষ্টা করছি,’ যোগ করেন খাদিজা।

এ ব্যাপারে মন্তব্যের জন্য এনআইকেডিউ পরিচালক সৈয়দ আলফা সানির সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।