সংবাদ সম্মেলনে চিকিৎসকরা

স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা ঘোষণা না করায় হামের রোগীরা স্বাস্থ্য অধিকারবঞ্চিত হয়েছে

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

হামের প্রাদুর্ভাবে স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা ঘোষণা না করায় মানুষ স্বাস্থ্য অধিকারবঞ্চিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন চিকিৎসকরা।

আজ শনিবার সকালে রাজধানীর সেগুন বাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত ‘হামে শিশু মৃত্যু: জনস্বাস্থ্য সংকট ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এ কথা বলেন।

চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।

ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট
লেলিন চৌধুরী | ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘যখন কোনো সংক্রামক রোগে জনস্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা জারি বা মহামারি ঘোষণা করা হয়, তখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সেই রোগটিকে রুটিন হিসেবে না দেখে জরুরি বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে আমরা চাইলে প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষার কিট তারা বাড়াতে পারতো।’

‘এ কারণে স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা ঘোষণা না করার মধ্য দিয়ে এ দেশের জনসাধারণের স্বাস্থ্য অধিকার—যার একটি হলো তার হাম হয়েছে কি না এই পরীক্ষা নিশ্চিত করার ব্যাপার থেকে মানুষকে বঞ্চিত করা হয়েছে,’ যোগ করেন তিনি।

দেশের প্রত্যেক জনস্বাস্থ্যবিদ ও বিশেষজ্ঞ মহামারি বা জনস্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা জারি করার পক্ষে ছিলেন উল্লেখ করে তিনি সরকারকে ঢাকার আইসিইউগুলোকে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) একটি ডাটাবেজের আওতায় আনার পরামর্শ দেন।

মাঠ পর্যায়ের চিত্র বর্ণনা করে তিনি বলেন, অভিভাবক মরণাপন্ন রোগীকে কোলে নিয়ে বা হাসপাতালের বিছানায় শুইয়ে রেখে একের পর এক অন্য হাসপাতাল ঘুরে জানতে হয় আইসিইউ খালি আছে কি না এবং যখন সে আইসিইউ পেয়ে ফিরে আসে, তখন দেখা যাচ্ছে দুঃখজনকভাবে সেই রোগীটি মৃত্যুবরণ করেছে।

হামের ধরন ব্যাখ্যা করে এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, হাম একটা জীবাণু, এর দুটো ভাগ আছে—একটি ওয়াইল্ড বা বুনো, আরেকটি হচ্ছে যেটি হাম সাধারণত তৈরি করে। ওয়াইল্ড মিজেল ভাইরাস এখন রোগ তৈরি করে না। যেটি দিয়ে এখন রোগ হচ্ছে, এই ভাইরাসের সেরোটাইপ আটটি দলে বিভক্ত। এর আবার উপদল রয়েছে—এ, বি, সি, ডি...এইচ পর্যন্ত।

‘বাংলাদেশে গত বছর পর্যন্ত যে হামগুলো হয়েছে, এটি সেই উপদলের ডি-৩, ডি-৮ ও বি-৪। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হতো ডি-৮ এবং কম হয় বি-৪। আমরা দেখছি, এইচ-১ জেনোটাইপ বাংলাদেশে এর আগে বিলুপ্ত ছিল। সম্প্রতি এশিয়ার দেশে দেশে এটি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে এটি আবার নতুন করে হচ্ছে কি না এবং বি-৪ জেনোটাইপ বাংলাদেশে নতুন করে হচ্ছে কি না সেটি দেখা দরকার,’ পরীক্ষার ওপর জোর দিয়ে বলেন তিনি।

ডা. লেলিন আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে আগে ডি-৪ দিয়ে যে সংক্রমণটা হতো, যদি সেটা হয়, তার মানে এটি দেশীয় সংক্রমণের নতুন একটি উত্থান। যেটা দেশে ছিল না, যদি সেটা এসে থাকে, তার মানে এটি ইমপোর্টেড। ইমপোর্টেড হলে কোন পথে আসছে?...সেই জায়গাগুলো আমরা চেক করা বা চিকিৎসার ধরনের কোনো পরিবর্তন আনতে হবে কি না, সেই ব্যাপারে কিন্তু আমরা কাজ করতে পারতাম।’

তিনি বলেন, ‘এই পরীক্ষার ব্যাপারটিতে আমাদের কর্তৃপক্ষ একেবারেই জোর দেয়নি। জেনোটাইপের বিষয়টা এখন পর্যন্ত ন্যূনতম আলোচনায় আনেনি।’

ডা. লেলিন আরও বলেন, ‘সব জায়গা থেকে বলা হচ্ছে যে, শিশু যত বেশি অপুষ্টিতে ভুগবে, তত বেশি (হামের) তার বিস্তার ঘটবে। আমরা জানি, আদর্শ মান হচ্ছে, শিশু জন্মের পরে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। ২০১৭-১৮ তে বাংলাদেশে শিশুকে প্রথম ছয় মাস বুকের দুধ খাওয়াতো ৬৫ শতাংশ মা। ২০২২ এ এটি নেমে এসেছে ৫৩ শতাংশে। এই যে ১৩ শতাংশ কেন কমে গেল, এর উত্তর কিন্তু এখনো খোঁজা হয়নি।’

‘আমার ব্যক্তিগত ধারণা, ২২-এ যেটি ৫৩ (শতাংশ) ছিল, আজকে ২৬-এ সেটি ৫০-এর নিচে আসতে পারে। এর কারণ কিন্তু আমরা জানি না। আমরা অনুমান করছি মাত্র, কারণটা জানলে শিশু পুষ্টির জন্য এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিংয়ের ব্যাপারে নতুন করে নতুন কৌশলে আমরা ক্যাম্পেইন করব কি না, সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারতাম,’ যোগ করেন তিনি।

নীতি-নির্ধারকদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘কোভিড থেকে আমরা শিক্ষা নেইনি। কোভিডের সময় সমস্ত ধরনের বিশেষজ্ঞরা একযোগে একটি কথা বলেছিলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মেডিকেল কেয়ার ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পাবলিক হেলথ—দুটি ভাগ করা হোক। তাহলে রোগ প্রতিরোধের ব্যাপারে আরও অনেক বেশি নিবেদিতভাবে আমরা কাজ করতে পারতাম। এখন পর্যন্ত সেটা আসেনি।’

‘এখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পাবলিক হেলথের ব্যাপারে কাজ করে, কিন্তু লোকবল সেখানে এত কম যে, পাবলিক হেলথের কাজটি নামকাওয়াস্তে হয়ে যায়,’ যোগ করেন তিনি।

ডা. লেলিন বলেন, ‘একেবারেই জন্মগতভাবে বা জাতিগতভাবে আমরা ব্লেইম গেম বা দোষারোপের খেলায় পারদর্শী। যে কারণে একটা প্রবাদের এসেছে, পৃথিবীর সব দেশের মানুষের দুটো হাত, কিন্তু বাঙালির তিনটি। ডান হাত, বাম হাত এবং অজুহাত। আমরা দেখতে পাই, অন্তর্বর্তী সরকারের যে অপরিণামদর্শী মানবতাবিরোধী অপরাধ, এটাকে বারবার উচ্চারণ করছি। কিন্তু সেই উচ্চারণ করে ও তাদের ঘাড়ে দোষটি চাপিয়ে কিন্তু বর্তমান কর্তৃপক্ষ পার পেয়ে যাবেন—এমন না। অ্যাম্বুলেন্সের সুব্যবস্থা, প্রয়োজনে ফিল্ড হাসপাতাল করা, ক্যাম্প হাসপাতাল করা অথবা রোগীকে সহজভাবে গাইড করার জন্য কিছু জরুরি সেবা ব্যবস্থা চালু করা তো খুব সহজ ব্যাপার!’

তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, হামের ভয়াবহ তাণ্ডব থামানোর জন্য অচিরেই কেন্দ্রীয়ভাবে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস এবং আইসিইউ ম্যানেজমেন্ট সার্ভিস করা হবে। সেই সঙ্গে জরুরি স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে হাম প্রতিরোধ ও হামের চিকিৎসা জোরদার পদক্ষেপ গ্রহণ করবে কর্তৃপক্ষ।

ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট
কাজী রকিবুল ইসলাম | ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

সংগঠনটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. কাজী রকিবুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে অধিকাংশ আইসিইউ বয়স্কদের জন্য। নবজাতকের জন্যও আছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের শিশু চিকিৎসক সমিতির থেকে এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে আমরা সরকারের কাছে আবেদন করেছি, প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে; জেলা পর্যায় পর্যন্ত পারলে সবচেয়ে ভালো, পিআইসিইউয়ের (শিশুদের জন্য বিশেষায়িত) ব্যবস্থা করা হোক। সেটি হয়নি। এখন বারবার প্রশ্ন আসছে এবং বলা হচ্ছে, আইসিইউয়ের ঘাটতি। আইসিইউয়ের ঘাটতি তো আছেই! বেসরকারি হাসপাতালেও নামমাত্র কয়েকটিতে ছাড়া কিন্তু পিআইসিইউ নাই। এটা আমাদের জানা দরকার।’

জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।