মূল্যস্ফীতি: পকেটভর্তি টাকা, কিন্তু বাজারের ব্যাগ ফাঁকা
মাসের শুরুতে আপনি বেতন পেয়েছেন ৩০ হাজার টাকা। মাসের শেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে দেখলেন, আগের মাসের মতোই খরচ করেছেন, কিন্তু হাতে টাকা নেই। বাজারের তালিকায়ও তেমন কোনো পরিবর্তন নেই, সেই একই চাল-ডাল-মাছ-মাংস বা বাসাভাড়া। তবু খরচ বেড়ে গেছে।
এখানেই মূল্যস্ফীতির গল্প।
সহজ করে বললে, আপনার নিত্যদিনের বাজারসদাই থেকে শুরু করে চুল কাটা, পানি বা বিদ্যুৎ বিল বাড়ছে এবং একই পরিমাণ টাকা দিয়ে আগের চেয়ে কম জিনিস কেনা যায়, তখন তাকে মূল্যস্ফীতি বলে।
মনে করুন, গত বছর ৫০০ টাকা দিয়ে পাঁচ কেজি চাল কিনতেন। এ বছর একই টাকায় চার কেজি কিনতে পারছেন। এই এক কেজি চাল মূল্যস্ফীতি খেয়ে ফেলেছে। আপনার জন্য এটাই মূল্যস্ফীতি। আপনার পকেটে টাকা একই আছে, কিন্তু সেই টাকার ক্ষমতা কমে গেছে।
মূল্যস্ফীতি কমেছে, কিন্তু দাম কি কমেছে?
আগস্টে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, জুলাই ২০২৬-এ দেশে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে, যা আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। জুনে ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। একই সময়ে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
শুনতে ভালো লাগতে পারে যে, মূল্যস্ফীতি কমেছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে বাজারের পণ্য আগের চেয়ে সস্তা হয়েছে। আসলে দাম বাড়ার গতি কমেছে, দাম কমেনি।
ধরুন, এক কেজি চালের দাম দুই বছর আগে ছিল ১০০ টাকা। পরের বছর তা থেকে বেড়ে ১০৮ টাকা হলো। আর এ বছর হয়েছে ১১৫ টাকা। মানে চালের দাম প্রতি বছরই বেড়েছে, কিন্তু প্রথম বছরের (৮ টাকা) তুলনায় পরের বছর (৭ টাকা) কম বেড়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে মনে হলেও আসলে চালের দাম কিন্তু কমেনি।
ব্রেক ধরলে গাড়ি থেমে যায়, কিন্তু অর্থনীতির গাড়ি কখনো থামে না। আর বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশে সাধারণত কোনো জিনিসের দাম বাড়ার পর কমে যাওয়ার উদাহরণ বিরল।
জুলাইয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে (জুনে ছিল ৮ দশমিক ৬০), আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কমেছে ৯ দশমিক ২৮ শতাংশে। এ কারণেই সামগ্রিক হার কিছুটা কমেছে। মানে পণ্য ও সেবার দাম বাড়ছে, শুধু বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে।
মূল্যস্ফীতি মাপা হয় কীভাবে?
বাজারের দু-একটি পণ্যের দাম দেখে মূল্যস্ফীতি বের করা হয় না। বিবিএস ৩৮৩টি পণ্যের ৭৪৯টি ধরন ও সেবার দাম সংগ্রহ করে। এতে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্য এবং গ্রাম ও শহরের দাম বিবেচনায় নেওয়া হয়।
চাল-ডাল, তেল, পোশাক, বাসাভাড়া, যাতায়াতসহ নানা খরচের পরিবর্তন এতে ধরা পড়ে।
সহজভাবে বললে, গত বছরের জুলাইয়ে এসব জিনিস কিনতে একজন মানুষকে গড়ে যত টাকা খরচ করতে হতো, এ বছরের জুলাইয়ে তার চেয়ে কত বেশি খরচ হচ্ছে, সেই পরিবর্তন থেকেই মূল্যস্ফীতির হার পাওয়া যায়।
জুলাইয়ে ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) ১৪৬ দশমিক ১১ থেকে বেড়ে ১৪৮ দশমিক ২১ হয়েছে। জুন থেকে জুলাইয়ে দাম বেড়েছে ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ, গত বছরের অক্টোবরের পর এক মাসে সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির হার কমলেও বাজারের সামগ্রিক দাম কমেনি।
মূল্যস্ফীতি আপনার পকেট কাটে কীভাবে?
মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে সহজ উদাহরণ হতে পারে খাবার।
ধরুন, গত বছর ১০০ টাকা দিয়ে আপনি একটা খাবার কিনতেন। ৫০০ টাকা দিয়ে পাঁচটা খাবার কেনা যেত। এখন সেই খাবারের দাম ১০৭ টাকা হলে ৫০০ টাকা দিয়ে পাঁচটা খাবার আর কেনা যাবে না। এটাই ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া।
বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা, পোশাক বা সন্তানের পড়াশোনার খরচও যদি একইভাবে বাড়ে, তখন মানুষকে কোথাও না কোথাও কাটছাঁট করতে হয়।
হয়তো আগে সপ্তাহে দুদিন মাছ কিনতেন, এখন এক দিন কিনছেন। মাসে একবার বাইরে খেতেন, এখন সেটা বাদ দিয়েছেন। মাস শেষে তিন হাজার টাকা জমাতেন, এখন আর জমাতে পারছেন না।
অর্থাৎ আয় একই থাকলেও আগের জীবন চালাতে এখন বেশি টাকা লাগছে।
সবার ওপর একই চাপ পড়ে না
মূল্যস্ফীতির চাপ কম আয়ের মানুষের ওপর বেশি পড়ে। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাবার, বাসা, যাতায়াতের মতো প্রয়োজনীয় খরচে চলে যায়।
ধরুন, একজনের আয় ২০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ১২ হাজার টাকা খাবার ও বাসাভাড়ায় চলে যায়। এসব খরচ বাড়লে তার হাতে অন্য খরচ কমানোর সুযোগ থাকে খুব কম। তখন তাকে সঞ্চয় ভাঙতে হয়, ধার করতে হয় বা প্রয়োজন কমাতে হয়।
এই কারণেই একই ৮ শতাংশ মূল্যস্ফীতি সবার জন্য একই রকম নয়। যার আয় বেশি, তার বাজেটে সামলানোর জায়গা থাকে। যার আয় কম, তার বাজেটের প্রায় পুরোটাই যদি প্রয়োজনীয় খরচে চলে যায়, তাহলে সামান্য দাম বাড়াও তার জন্য বড় ধাক্কা।
শুধু বাজারের ব্যাগ নয়, সঞ্চয়ের ওপরও চাপ
মূল্যস্ফীতির আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে সঞ্চয়ে।
ধরুন, আপনি অনেক কষ্ট করে ব্যাংকে এক লাখ টাকা জমিয়েছেন। এক বছর পর সেই টাকার অঙ্ক একই থাকল। কিন্তু এর মধ্যে যদি জিনিসপত্রের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, তাহলে সেই এক লাখ টাকা দিয়ে আগের মতো জিনিস কেনা যাবে না।
অর্থাৎ ব্যাংকের হিসাবে আপনার টাকা একই আছে, কিন্তু বাস্তবে টাকার মূল্য কমে গেছে। এ কারণেই মূল্যস্ফীতি শুধু আজকের বাজার খরচের সমস্যা নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রাখা টাকার মূল্যও কমিয়ে দেয়।
বেতন বাড়লেও স্বস্তি আসে না কেন?
জুলাইয়ে বাংলাদেশের জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।
অর্থাৎ গড়ে মজুরি বাড়ার হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে সামান্য কম। সহজ ভাষায়, মানুষের আয় যতটা বেড়েছে, জিনিসপত্রের দাম তার চেয়ে একটু বেশি বেড়েছে। ফলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা এখনো চাপের মধ্যে।
তাই কারও বেতন ৮ শতাংশ বাড়লেও যদি তার নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ ৯ শতাংশ বাড়ে, তাহলে কাগজে বেতন বাড়লেও বাস্তবে তার জীবনযাত্রায় স্বস্তি নাও আসতে পারে।
সব জিনিসের দাম কি একই হারে বাড়ে?
মূল্যস্ফীতির ফলে সব পণ্যের দাম একই হারে বাড়ে না।
জুলাইয়ে পরিবহন খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ। যোগাযোগ খাতে তা ছিল ৬ দশমিক ৯০ শতাংশ। রেস্তোরাঁ ও হোটেল খাতে মূল্যস্ফীতি আরও বেশি, ১২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ‘বিবিধ পণ্য ও সেবা’ খাতে ছিল ১৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যা খাদ্যবহির্ভূত খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ।
তাই যে মানুষ প্রতিদিন বাসে যাতায়াত করেন, তার ওপর চাপ এক রকম। যিনি নিয়মিত বাইরে খান, তার চাপ আবার অন্য রকম।
দাম বাড়ে কেন?
এর অনেক কারণ থাকতে পারে।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, খাদ্য বা কাঁচামালের দাম বাড়লে তার প্রভাব দেশের বাজারেও পড়ে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম না বাড়লেও ডলারের দাম বেড়ে গেলে আমদানি করতে বেশি টাকা লাগে। সেই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে আসতে পারে।
ধরুন, বিদেশ থেকে ১০০ ডলারের একটি পণ্য আনতে আগে যে পরিমাণ টাকা লাগত, ডলারের দাম বাড়লে একই পণ্য আনতে এখন বেশি টাকা লাগবে। ব্যবসায়ী সেই বাড়তি খরচের একটি অংশ পণ্যের দামে যোগ করতে পারেন।
এরপর দাম বাড়ার ঢেউ অন্য জায়গায়ও যায়।
জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে। পরিবহন খরচ বাড়লে বাজারে পণ্য আনতে খরচ বাড়ে। কাঁচামালের দাম বাড়লে কারখানার উৎপাদন খরচ বাড়ে। ফলে শেষ পর্যন্ত ক্রেতাকেই বেশি দাম দিতে হয়।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়া, ডলার সংকট, টাকার দরপতন, মজুতদারি ও বাজার কারসাজিও দাম বাড়াতে পারে।
মূল্যস্ফীতি কমলে কি আগের দাম ফিরে আসে?
সবসময় নয়। পণ্যের দাম ১০০ টাকা থেকে ১২০ টাকা হওয়ার পর ১২৫ টাকা হলে মূল্যস্ফীতির হার কমতে পারে। কিন্তু পণ্যের দাম ১০০ টাকায় ফিরে যায়নি।
তাই ‘মূল্যস্ফীতি কমেছে’ এবং ‘বাজারে দাম কমেছে’, এই দুটি এক কথা নয়।
জুলাইয়ের মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ হলেও ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের একটি সংখ্যা দিয়ে পুরো পরিস্থিতি বোঝা যায় না।
শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে সহজ হিসাবটি অর্থনীতির বইয়ে নয়, বাজারের ব্যাগে। এক বছর আগে যে টাকা দিয়ে পাঁচটি জিনিস কেনা যেত, এখন যদি চারটি কিনতে হয়, তাহলে বুঝতে হবে টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
সোজা কথায়, মূল্যস্ফীতি মানে শুধু জিনিসের দাম বাড়া নয়, এর মানে একই টাকায় আগের চেয়ে কম ‘জীবন’ কেনা।