যেভাবে ভাসমান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে যাচ্ছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি
মার্কিন নৌবাহিনী তাদের পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডকে ভাসমান বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব কি না, তা পরীক্ষা করতে যাচ্ছে।
মেরিন ইনসাইট ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নরফোক নেভাল স্টেশনে পরিকল্পিত এ পরীক্ষায় যুদ্ধজাহাজটি ঘাট থেকে বিদ্যুৎ নেওয়ার বদলে নিজস্ব পারমাণবিক চুল্লিতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নৌঘাঁটিতে সরবরাহ করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের ভাষ্য, সংঘাত, সাইবার হামলা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় সামরিক ঘাঁটির জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরীক্ষা সফল হলে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড সামরিক স্থাপনার জন্য অস্থায়ী ভাসমান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারবে। জরুরি পরিস্থিতিতে বেসামরিক অবকাঠামোতেও সহায়তা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি হাং কাও জানিয়েছেন, চলতি বছরের শেষ দিকে একটি বিমানবাহী রণতরি থেকে নরফোক নেভাল স্টেশনে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
পরে নৌবাহিনীর এক মুখপাত্র মেরিন ইনসাইটকে নিশ্চিত করেন, এটি সামরিক স্থাপনাগুলোর ‘জ্বালানি সহনশীলতা ও মিশন নিশ্চয়তা’ বাড়ানোর বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
নৌবাহিনী বলছে, জরুরি পরিস্থিতিতে ফোর্ড ক্লাসের বিমানবাহী রণতরি কীভাবে তীরবর্তী স্থাপনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে, এই পরীক্ষার মাধ্যমে সেটিই প্রদর্শন করা হবে।
ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডে রয়েছে দুটি এ ওয়ান বি পারমাণবিক চুল্লি। এগুলো পুরোনো নিমিটজ-ক্লাসের রণতরিতে ব্যবহৃত চুল্লির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। যদিও সুনির্দিষ্ট সক্ষমতা গোপন রাখা হয়েছে। তবে ধারণা করা হয়, এগুলো আগের প্রজন্মের চুল্লির তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি শক্তি উৎপাদন করতে পারে।
পরীক্ষার সময় বিশেষ শোর কানেকশন সিস্টেমের মাধ্যমে রণতরি থেকে সরাসরি ঘাঁটির বৈদ্যুতিক নেটওয়ার্কে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুরো প্রক্রিয়াটি প্রযুক্তিগতভাবে জটিল। কারণ, জাহাজের বিদ্যুৎব্যবস্থাকে ঘাঁটির ভোল্টেজ ও ফ্রিকোয়েন্সির সঙ্গে নিখুঁতভাবে সামঞ্জস্য করতে হবে। এ বিষয়ে ব্যবহৃত প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের বিস্তারিত প্রকাশ করেনি নেভি।
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সামরিক ঘাঁটিগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা।
এছাড়া পেন্টাগন দুর্যোগকবলিত এলাকায় বিমানবাহী রণতরি থেকে বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা সম্ভব কি না, তা খতিয়ে দেখছে।
হাং কাও বলেন, বিমানবাহী রণতরিগুলোতে থাকা 'লবণাক্ততা দূরীকরণ ব্যবস্থার' মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি উৎপাদন করা যায়। খরা বা দুর্যোগকবলিত এলাকাগুলোতেও এই সক্ষমতা কাজে লাগানো যেতে পারে।
যুদ্ধজাহাজকে বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের ধারণা অবশ্য নতুন নয়।
১৯২৯ সালে বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস লেক্সিংটন জলবিদ্যুৎ সংকটে আক্রান্ত ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের টাকোমা শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহে সহায়তা করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কয়েকটি ডেস্ট্রয়ার এসকর্ট জাহাজকে ভাসমান বিদ্যুৎকেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়।
এছাড়া ১৯৬৮ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে পানামা খাল এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী স্টার্জিস নামের একটি ভাসমান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করেছিল।
মেরিন ইনসাইট জানায়, আধুনিক পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরিকে এভাবে ব্যবহার নতুন ধরনের প্রযুক্তিগত ও নিয়ন্ত্রণ চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামরিক পারমাণবিক চুল্লিকে বেসামরিক বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করতে নিউক্লিয়ার রেগুলেটরি কমিশনসহ বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। একইসঙ্গে এ ধরনের বিদ্যুৎ সরবরাহ জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, চুল্লি পরিচালনা বা যুদ্ধ প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলবে কি না, সে প্রশ্নও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যগুলোর খবর অনুযায়ী, সম্প্রতি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড টানা ২৯৫ দিনের বেশি সমুদ্রে কাটিয়েছে। যা ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর দীর্ঘতম মার্কিন বিমানবাহী রণতরি মোতায়েনের রেকর্ড।
তবে নরফোকে পরীক্ষার নির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঘোষণা করেনি মার্কিন নৌবাহিনী।