আলোর আড়ালে জোনাকির প্রথম জীবন

খেংসাপ্রু মারমা

বৃষ্টি থামার পর সন্ধ্যা নেমেছে। বনের স্যাঁতসেঁতে মাটিতে জমে আছে ঝরা পাতা। হঠাৎ সেই পাতার ফাঁক থেকে জ্বলে উঠল ক্ষীণ নীলাভ-সবুজ আলো। দূর থেকে মনে হতে পারে, মাটিতে যেন ছোট্ট কোনো তারা নেমে এসেছে। কিন্তু এটি কোনো তারা নয়, রাতের আকাশে উড়ে বেড়ানো পরিচিত জোনাকিও নয়। এটি জোনাকি পোকার লার্ভা। জোনাকির জীবনচক্রের এমন এক পর্যায় এটি, যার সঙ্গে আমাদের অধিকাংশেরই পরিচয় নেই।

জোনাকির ঝলমলে আলো আমাদের মুগ্ধ করে। কিন্তু পূর্ণবয়স্ক হয়ে সেই আলো ছড়ানোর আগে তার জীবনের দীর্ঘ একটি সময় কেটে যায় চোখের আড়ালে। ঝরা পাতার নিচে, ভেজা মাটিতে কিংবা পচা গাছের গুঁড়ির আশপাশে লুকিয়ে থেকেই বেড়ে ওঠে এই ক্ষুদ্র প্রাণী।

প্রথম দেখায় জোনাকির লার্ভাকে জোনাকি বলে মনে হওয়ার কথা নয়। এর দেহ চ্যাপ্টা, গাঢ় রঙের এবং শক্ত আবরণে ঢাকা। শরীরের শেষ প্রান্তে জ্বলে মৃদু নীলচে-সবুজ আলো। দেখতে প্রাপ্তবয়স্ক জোনাকির চেয়ে একেবারেই আলাদা হলেও জীবনচক্রের এই পর্যায় পেরিয়েই একসময় পূর্ণাঙ্গ জোনাকিতে রূপ নেয় এটি।

লার্ভা জোনাকি। ছবি: বর্ধন মারমা জুনান

ঝরা পাতার নিচে এক দীর্ঘ শৈশব

প্রাপ্তবয়স্ক জোনাকির জীবন সাধারণত কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়। অথচ লার্ভা হিসেবেই কেটে যায় তার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়। প্রজাতি ও পরিবেশভেদে অনেক জোনাকি লার্ভা প্রায় দুই বছর পর্যন্ত মাটি, ঝরা পাতা ও আর্দ্র পরিবেশে বসবাস করে।

দিনের আলোয় তারা লুকিয়ে থাকে। আর রাত নামলে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে আসে। আকারে ছোট হলেও লার্ভা জোনাকিও দক্ষ শিকারি। শামুক, স্লাগ, কেঁচোসহ বিভিন্ন নরমদেহী অমেরুদণ্ডী প্রাণী তাদের প্রধান খাদ্য।

এসব প্রাণী শিকার করার মাধ্যমে জোনাকি লার্ভা তাদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। এর মধ্য দিয়ে বনজ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতেও ভূমিকা রাখে এই ক্ষুদ্র শিকারি।

ছবি: সংগৃহীত

লার্ভা থেকে ডানাওয়ালা জোনাকি

বড় হয়ে ওঠার পর লার্ভা প্রবেশ করে পিউপা বা মূককীট পর্যায়ে। মাটি বা ঝরা পাতার ভেতরে নিরাপদ আশ্রয়ে তখন শুরু হয় তার দেহের রূপান্তর। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় মেটামরফোসিস।

রূপান্তর শেষে বেরিয়ে আসে ডানাওয়ালা পূর্ণবয়স্ক জোনাকি। তখনই দেখা যায় তার পরিচিত আলোক-উৎপাদক অঙ্গ। তবে মানুষের কাছে জোনাকির যে পর্যায়টি সবচেয়ে পরিচিত, সেটিই তার জীবনের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সময়।

দীর্ঘদিন লার্ভা হিসেবে কাটানোর পর প্রাপ্তবয়স্ক জোনাকি সাধারণত মাত্র কয়েক সপ্তাহ বেঁচে থাকে। এই সময়ে তার প্রধান কাজ সঙ্গী খুঁজে প্রজনন করা এবং নতুন প্রজন্মের সূচনা করা।

ছবি: সংগৃহীত

আত্মরক্ষার আলো

জোনাকির আলো বলতেই অনেকের মনে আসে সঙ্গী খোঁজার সংকেত। প্রাপ্তবয়স্ক জোনাকির ক্ষেত্রে আলো সঙ্গীর সঙ্গে যোগাযোগের কাজে ব্যবহৃত হলেও লার্ভার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা ভিন্ন।

প্রাপ্তবয়স্ক জোনাকি ঝলকানো আলোর মাধ্যমে সঙ্গীর সঙ্গে যোগাযোগ করে। অন্যদিকে লার্ভার আলো স্থির ও অবিরাম। এই আলোর উদ্দেশ্য সঙ্গীকে আকর্ষণ করা নয়, বরং সম্ভাব্য শিকারিকে সতর্ক করা।

অনেক প্রজাতির জোনাকি লার্ভার দেহে লুসিবুফাজিন নামের বিষাক্ত স্টেরয়েড-জাতীয় রাসায়নিক থাকে। কোনো পাখি, ব্যাঙ, মাকড়সা বা ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী তাদের খাওয়ার চেষ্টা করলে এই রাসায়নিকের কারণে অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে পারে। ফলে পরে তারা এমন জ্বলজ্বলে লার্ভাকে এড়িয়ে চলতে শেখে।

জীববিজ্ঞানে এ ধরনের সতর্ক সংকেতকে বলা হয় অ্যাপোসেমাটিজম। অর্থাৎ রং, আলো বা অন্য কোনো দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে সম্ভাব্য শিকারিকে সংকেত দেওয়া—‘আমাকে খাওয়া নিরাপদ নয়।’

অন্ধকার বনভূমিতে জোনাকি লার্ভার সেই ক্ষীণ আলো তাই আত্মরক্ষার কৌশলেরও অংশ।

ছবি: সংগৃহীত

অদেখা পরিবেশ রক্ষক

জোনাকি লার্ভা খুব একটা চোখে পড়ে না। কিন্তু প্রকৃতিতে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শামুক, স্লাগসহ নানা নরমদেহী অমেরুদণ্ডী প্রাণী শিকার করার মাধ্যমে তারা এসব প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। এর মধ্য দিয়ে বন, বাগান ও জলাভূমির পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতেও ভূমিকা রাখে।

এসব অমেরুদণ্ডী প্রাণীর কিছু প্রজাতি ফসল ও উদ্ভিদের ক্ষতি করতে পারে। ফলে জোনাকি লার্ভার শিকারি আচরণ প্রাকৃতিক জৈব নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবেও কাজ করে এবং রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়ক হতে পারে।

লার্ভা জোনাকি। ছবি: বর্ধন মারমা জুনান

আজকের লার্ভাই আগামী দিনের জোনাকি

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জোনাকির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে বনভূমি ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস, কৃত্রিম আলোকদূষণ, অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো নানা কারণ।

আরেকটি সমস্যা হলো, অনেক মানুষ জোনাকি লার্ভাকে চিনতে পারেন না। দেখতে অদ্ভুত হওয়ায় অনেক সময় একে ক্ষতিকর পোকা ভেবে মেরে ফেলা হয়। অথচ এই ছোট্ট প্রাণীটি মানুষের কোনো ক্ষতি করে না। জীবনচক্রের এই পর্যায় পেরিয়েই একসময় জন্ম নেয় পূর্ণবয়স্ক জোনাকি।

তাই জোনাকির আলো বাঁচাতে হলে শুধু রাতের আকাশে উড়ে বেড়ানো পূর্ণবয়স্ক জোনাকির দিকে তাকালেই হবে না। নজর দিতে হবে আমাদের পায়ের নিচের পরিবেশেও।

ঝরা পাতার স্তর অকারণে সরিয়ে না ফেলা, স্যাঁতসেঁতে প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ করা এবং অপ্রয়োজনীয় কীটনাশকের ব্যবহার কমানো—এমন ছোট ছোট উদ্যোগ জোনাকির আবাসস্থল রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।

তাই পরেরবার বৃষ্টির পর ঝরা পাতার নিচে যদি ক্ষীণ কোনো আলো জ্বলতে দেখেন, একবার থেমে তাকান। হয়তো সেটিই প্রকৃতির সবচেয়ে মোহনীয় আলোর গল্পের প্রথম অধ্যায়।