উপকূলে খাবার পানিতে লবণাক্ততা, হৃদরোগের ঝুঁকিতে ৫ জনে একজন
দেশের উপকূলীয় দুটি উপজেলায় মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ত পানি পান করার কারণে ৪০ বছরের বেশি বয়সী প্রতি পাঁচজনে একজন মাঝারি থেকে উচ্চ মাত্রার হৃদরোগের ঝুঁকিতে আছেন। সম্প্রতি পরিচালিত এক গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে এই চিত্র উঠে এসেছে।
গতকাল সোমবার ঢাকায় এক সেমিনারে এই তথ্য তুলে ধরা হয়। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এবং যুক্তরাজ্যের ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন যৌথভাবে এই সেমিনারের আয়োজন করে।
সেমিনারে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন আইসিডিডিআর,বির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলিয়া নাহিদ। তিনি জানান, এনআইএইচআর গ্লোবাল হেলথ রিসার্চ সেন্টার ফর নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল চেঞ্জের বাংলাদেশ কর্মসূচির অধীনে ২০২৩ সালে এই গবেষণা শুরু হয়, যা আগামী বছর শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
আলিয়া নাহিদ বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকার মানুষ প্রতিদিন যে পানি ব্যবহার করেন তা এখন স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে। খাবার পানিতে লবণাক্ততা এখন আর কেবল পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ নয়; বেশি মাত্রায় সোডিয়াম শরীরে যাওয়ায় উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও কিডনির রোগ দেখা দিচ্ছে। বাড়তি ঝুঁকিতে থাকছেন অন্তঃসত্ত্বা নারীরা।’
গবেষণায় খুলনার কয়রা ও সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার ৭১টি কমিউনিটি ক্লিনিক এলাকার ১৭২টি গ্রামের খাবার পানির উৎসগুলো মূল্যায়ন করা হয়। গবেষকরা মোট ২৭ হাজার ৬৯৭টি পানির উৎস জরিপ করেন। এর মধ্যে ৬ হাজার ৭০৩টি বা ২৪ দশমিক ২ শতাংশ উৎস থেকে সরাসরি খাবার পানি নেওয়া হয়। জরিপে দেখা যায়, কয়রার ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং আশাশুনির ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ খাবার পানির উৎসে লবণাক্ততা রয়েছে।
এই দুই উপজেলার ৪০ বছর ও তার বেশি বয়সী ১৫ হাজার ৪৭১ জন প্রাপ্তবয়স্কের হৃদরোগের ঝুঁকি মূল্যায়ন করেন গবেষকরা। এতে দেখা যায়, সার্বিকভাবে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের আগামী ১০ বছরে মাঝারি থেকে উচ্চ মাত্রার হৃদরোগের ঝুঁকি রয়েছে। কয়রার ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং আশাশুনির ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের মধ্যে এই ঝুঁকি পাওয়া গেছে।
আলিয়া নাহিদ জানান, লবণাক্ত পানি পানের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক রয়েছে। উচ্চ রক্তচাপ হৃদরোগের প্রধান কারণ। লিঙ্গভেদ ও তামাক ব্যবহারের মতো অন্যান্য কারণে দুই উপজেলার মানুষের ঝুঁকির মাত্রায় পার্থক্য থাকতে পারে।
এর আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক জরিপে দেখা গিয়েছিল, জাতীয়ভাবে ৪০ থেকে ৬৯ বছর বয়সীদের মধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। বিপরীতে নতুন এই গবেষণায় দুই উপজেলার একই বয়সীদের মধ্যে এই ঝুঁকি প্রায় ১১ শতাংশ এবং ৪০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে তা ২১ দশমিক ৬ শতাংশ পাওয়া গেছে।
সেমিনারে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক পাওলো ভিনিস বলেন, খাবার পানিতে ঠিক কী পরিমাণ লবণাক্ততা থাকলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তার কোনো সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড এখনো তৈরি হয়নি।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান বাটলার ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে পুকুর এবং ভূগর্ভস্থ পানি দীর্ঘ মেয়াদে লবণাক্ত হওয়ার প্রমাণ তুলে ধরেন। তিনি বাঁধগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও উঁচু করার পাশাপাশি জলোচ্ছ্বাসের পর দ্রুত পানির উৎসগুলো পরিষ্কার করার ওপর জোর দেন।
আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ বলেন, জনস্বাস্থ্যের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রমাণিত হয় এমন গবেষণার ঘাটতি আছে বাংলাদেশে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ফাহমিদা খানম বলেন, লবণাক্ততা ইতিমধ্যেই উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন এটিকে আরও তীব্র করবে। এ ধরনের গবেষণা জাতীয়ভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. লুৎফর রহমান এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি।