৭৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরও খুলনা ডুবছে কেন?
জলাবদ্ধতা নিরসনে ছয় বছরে ৭৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে খুলনায়। পুনঃখনন করা হয়েছে খাল, নতুন ড্রেন নির্মাণের পাশাপাশি সংস্কার হয়েছে পুরোনো ড্রেন, উঁচু করা হয়েছে নগরের বিভিন্ন সড়কও। এরপরও মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে তিনবার পানিতে ডুবেছে খুলনা নগরী।
চলতি মাসের ১ জুলাই মৌসুমি বৃষ্টিতে নগরের বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যায়। ৯ জুলাই আবারও একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত টানা ভারী বৃষ্টিতে নগরের প্রায় অর্ধেক এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। সড়ক, অলিগলি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও হাজার হাজার বাড়িঘর পানির নিচে চলে যাওয়ায় স্থবির হয়ে পড়ে জনজীবন।
তবে শুধু ভারী বৃষ্টিই খুলনার এই দুর্ভোগের কারণ নয় বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, একের পর এক জলাশয় ভরাট, খালের স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট হওয়া, সড়ক ও আবাসিক এলাকার উচ্চতায় ভারসাম্যহীনতা এবং সমন্বিত পানি নিষ্কাশন পরিকল্পনার অভাব জলাবদ্ধতাকে ক্রমেই জটিল করে তুলেছে।
এক যুগ আগেও খুলনায় ভারী বৃষ্টির পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যেত। কিন্তু এখন মাত্র কয়েক ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতেই নগরজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। চলতি মাসে অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনবার নগর ডুবে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—শত শত কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও কেন জলাবদ্ধতা কমছে না? সমস্যা কি শুধু অতিবৃষ্টি, নাকি খুলনা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে তার প্রাকৃতিক পানি ধারণক্ষমতা?
খুলনা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়া কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত খুলনায় ৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এরপর শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত আরও ১৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
উঁচু হয়েছে সড়ক, নিচু হয়ে গেছে বাড়ি
খুলনা সিটি করপোরেশনের আওতায় বর্তমানে প্রায় ৭৬ হাজার হোল্ডিং রয়েছে। নগর পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাবে, এর মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার হোল্ডিং এখন আশপাশের সড়ক ও ড্রেনের তুলনায় নিচু অবস্থানে রয়েছে।
ফলে বৃষ্টির পানি একবার বাড়ির ভেতরে ঢুকলে তা সহজে বের হতে পারে না। অনেক এলাকায় সড়ক থেকে পানি নেমে গেলেও বাড়ির আঙিনা ও নিচতলা ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনও কয়েক দিন পানির নিচে থাকে।
গত এক দশকে নগরের বিভিন্ন সড়ক ও ড্রেন একাধিকবার উঁচু করা হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে গত ছয় বছরে ৭৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর আওতায় খাল পুনঃখনন, নতুন ড্রেন নির্মাণ এবং পুরোনো ড্রেন সংস্কার করা হয়েছে।
তবে এসব উন্নয়নকাজের সঙ্গে আবাসিক এলাকাগুলোর উচ্চতা সমন্বয় করা হয়নি। ফলে অনেক এলাকায় সড়ক উঁচু বাঁধের মতো হয়ে গেছে, আর বাড়িগুলো নিচু পাত্রে পরিণত হয়েছে। ভারী বৃষ্টি হলে সড়কের পানি নিচু বাড়িগুলোর দিকে নেমে আসে। কিন্তু কার্যকর নিষ্কাশনব্যবস্থা না থাকায় সেই পানি দীর্ঘ সময় সেখানে আটকে থাকে।
নগরের দোলখোলার মন্দিরসংলগ্ন বড় গলির বাসিন্দা ইসমাইল শেখ বলেন, ‘গত দুই দিনের বৃষ্টির পানি কোনোভাবেই বাড়ি থেকে বের হচ্ছে না। নিচতলার ভাড়াটিয়াদের তিনটি কক্ষ দুই দিন ধরে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে আছে।’
তিনি বলেন, ‘আগে দীর্ঘ সময় বৃষ্টি হলেও ঘরে পানি উঠত না। এখন কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই নিচতলার রান্নাঘর, শোবার ঘর ও উঠান পানিতে তলিয়ে যায়।’
কোথায় গেল নগরের জলাধার
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খুলনার জলাবদ্ধতা বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ প্রাকৃতিক জলাধার দ্রুত হারিয়ে যাওয়া।
নগরের রোতাববাগ এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা দুলাল চন্দ্র মণ্ডল বলেন, ‘একসময় শহরের প্রায় প্রতিটি মহল্লায় বড় পুকুর, দিঘি ও নিচু জমি ছিল। বর্ষার অতিরিক্ত পানি স্বাভাবিকভাবেই এসব স্থানে জমা হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে জলাধারগুলোর বড় অংশ কংক্রিটের নগরায়ণের মধ্যে হারিয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমার বাড়ির সামনে রয়্যাল মোড়ের পাশে বর্তমান শিশুপার্ক এলাকায় একসময় বড় একটি পুকুর ছিল। শেখপাড়ার সিংহের মাঠের পাশেও বিশাল জলাশয় ছিল। পিটিআই এলাকা, সিটি ল কলেজ চত্বরসহ নগরের অনেক স্থানে পুকুর ছিল, যেগুলোর অধিকাংশ এখন আর নেই।’
দুলাল চন্দ্র বলেন, ‘আধুনিক খুলনা রেলস্টেশন এলাকায় একসময় অন্তত নয়টি বড় পুকুর ছিল। এখন সেখানে রেললাইন ও বিভিন্ন নগর অবকাঠামো। কোথাও ভবন হয়েছে, কোথাও সড়ক, আবার কোথাও গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক স্থাপনা।’
ফলে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণের যে প্রাকৃতিক ব্যবস্থা একসময় নগরে ছিল, তা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
জলাশয়ের অধিকাংশ ভরাট
খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আবির উল জব্বার বলেন, ২০১১ সালে মহাপরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের সময় নগরে প্রায় ৩ হাজার ৫৯২টি সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জলাশয় ছিল। এসব জলাশয়ের মোট আয়তন ছিল ১ হাজার ১১ একর।
তবে ব্যক্তিমালিকানাধীন পুকুরগুলোর অধিকাংশই ইতোমধ্যে ভরাট হয়ে গেছে বলে জানান তিনি।
বর্তমানে ১৮টি সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক পুকুর সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ-সংক্রান্ত নকশার কাজও শেষ হয়েছে।
আবির উল জব্বার বলেন, ‘একটি নগরের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ জলাভূমি থাকা প্রয়োজন।’
এদিকে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) সর্বশেষ জলাশয় জরিপ সম্পন্ন হয় ২০২৫ সালে। ওই জরিপে ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) মানচিত্রে জলাশয় হিসেবে চিহ্নিত স্থানগুলোর বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হয়।
কেডিএর তথ্য অনুযায়ী, ড্যাপের মানচিত্রে নগরের ৩১টি ওয়ার্ডে মোট ২৯৮টি জলাশয় ছিল। এর মধ্যে ৮০টির অস্তিত্ব পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে। আরও ২৭টি জলাশয় আংশিকভাবে ভরাট হয়েছে। বাকি জলাশয়গুলো টিকে থাকলেও সেগুলোর অবস্থাও নাজুক।
স্রোতের খাল এখন ‘মৃত নালা’
জলাশয় হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নগরের খালগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহও আগের মতো নেই বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।
নগরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কারিগরপাড়ার বাসিন্দা আব্দুল হামিদ বলেন, ‘১৫ থেকে ২০ বছর আগে কারিগরপাড়া খালে যে স্রোত ছিল, সংস্কারের অভাবে সেটি এখন প্রায় মৃত নালায় পরিণত হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই আমাদের ওয়ার্ডের নাপিতপাড়া, কুন্ডুপাড়া, বৈরাগীপাড়া, সাহাপাড়া, সবুজ সংঘ মাঠ, দৌলতপুর ডে-নাইট কলেজ এলাকাসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।’
আব্দুল হামিদ বলেন, ‘গত রাতের বৃষ্টিতেও একই চিত্র দেখা গেছে। পুরো এলাকা হাঁটু থেকে কোথাও কোথাও কোমরসমান পানিতে তলিয়ে ছিল।’
‘জলাশয় শুধু সৌন্দর্যের অংশ নয়’
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক মো. আহসানুল কবির বলেন, ‘একটি শহরের পুকুর বা জলাশয় শুধু সৌন্দর্যের অংশ নয়; এগুলো প্রাকৃতিক জলাধার। স্বল্প সময়ে ভারী বৃষ্টি হলে অতিরিক্ত পানি সাময়িকভাবে ধারণ করে এগুলো জলাবদ্ধতা কমাতে সাহায্য করে। কিন্তু এসব জলাশয় হারিয়ে গেলে সেই পানি শেষ পর্যন্ত রাস্তাঘাট ও মানুষের বাড়িঘরেই জমে।’
সিটি করপোরেশনের সড়ক ও ড্রেন উঁচু করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘রাস্তা উঁচু করার ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে কোনো প্রভাব পড়ছে কি না, তা আগে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে এমনভাবে ড্রেন নির্মাণ করতে হবে, যাতে বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে নিচু এলাকায় প্রবাহিত হতে পারে এবং সেখান থেকে পাম্পিং স্টেশনের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্কাশন করা যায়।’
এই অধ্যাপক বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে খুলনায় অমাবস্যা বা পূর্ণিমার সময় জোয়ার থাকলে এবং একই সময়ে ভারী বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা থাকেই। তখন কার্যকর পাম্পিংয়ের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন করতে হয়। সম্ভবত খুলনা সিটি করপোরেশনের সেই সক্ষমতা নেই।’
অধ্যাপক আহসানুল কবিরের মতে, খুলনার জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি একটি পূর্ণাঙ্গ ‘স্টর্ম ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান’। পুরো নগরের ডিজিটাল উচ্চতা মানচিত্র তৈরি করে কোথায় পানি জমে, কোথায় পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং কোন জলাধার পুনরুদ্ধার করা সম্ভব—এসব তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা নিতে হবে।
একইসঙ্গে অবশিষ্ট পুকুর ও জলাশয় সংরক্ষণ এবং দখল হয়ে যাওয়া খাল পুনরুদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব এলাকার বাড়িঘর সড়কের তুলনায় অনেক নিচু হয়ে গেছে, সেখানে শুধু ড্রেন নির্মাণ করে সমস্যার সমাধান হবে না। স্থানীয় ড্রেনেজব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় পাম্পিং ব্যবস্থা এবং পর্যায়ক্রমে ভূমির উচ্চতা সমন্বয়ের পরিকল্পনাও নিতে হবে। অন্যথায় প্রতিবছর বর্ষায় একই দুর্ভোগ ফিরে আসবে।
‘এক অংশের উন্নয়ন অন্য অংশে সমস্যা তৈরি করছে’
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) খুলনার সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, ‘একটি শহরের পানি ব্যবস্থাপনা শুধু ড্রেন নির্মাণের বিষয় নয়। সড়ক ও আবাসিক এলাকার উচ্চতা, খাল, জলাশয়, নদীর সঙ্গে সংযোগ, পাম্পিং ব্যবস্থা এবং বৃষ্টির পানি ধারণের স্থান—সবকিছুই একটি সমন্বিত পরিকল্পনার অংশ হওয়া উচিত।’
তিনি বলেন, ‘এই সমন্বয় না থাকলে একটি অংশের উন্নয়ন অন্য অংশে নতুন সমস্যা তৈরি করতে পারে। বর্তমান জলাবদ্ধতা পরিস্থিতিই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, খুলনার জলাবদ্ধতা নিরসনে বিচ্ছিন্নভাবে সড়ক উঁচু করা কিংবা ড্রেন নির্মাণ যথেষ্ট নয়। নগরের ভূমির উচ্চতা, খাল, জলাশয়, নদীর জোয়ার, পানি ধারণের স্থান ও নিষ্কাশনব্যবস্থাকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। তা না হলে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের পরও বর্ষা এলেই বারবার পানিতে ডুববে খুলনা।