ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসে মৃত্যু, ‘কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই’ ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের
রাতে যখন পাহাড়জুড়ে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয় তখনই ঘুম ভেঙে যায় এহসানুল্লাহর। গত কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি হলেই যেন ঘুমাতে ভয় পাচ্ছেন তিনি।
কক্সবাজারের উখিয়ায় ক্যাম্প-৬ এর একটি খাড়া পাহাড়ের ঢালে বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে তৈরি অস্থায়ী ঘরে পরিবার নিয়ে থাকেন তিনি।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে পালিয়ে আসার পর থেকে গত কয়েকবছর এই ঘরেই তিনি ছিলেন। বড় কোনো সমস্যা ছাড়াই বসবাস করছিলেন এহসান।
কিন্তু গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণে পাহাড়ের ঢাল থেকে রক্ষার প্রতিরক্ষা দেয়ালটি দুর্বল হয়ে গেছে। যেকোনো মুহূর্তে পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আর এমন কিছু হলে মুহূর্তেই চাপা পড়তে পারে তার পুরো ঘর।
এহসানুল্লাহ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই ঘুমাতে ভয় পাই। পাহাড়ধসে অনেক মানুষ মারা যাবে। আমাদের নিচের ঘরগুলো আরও বেশি ঝুঁকিতে। আমাদের আর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। ক্যাম্পগুলোতে কোনো খালি জমি নেই। এখন শুধু আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই।’
ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিরক্ষা দেয়াল শক্ত করার জন্য তারা বারবার কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করলেও এখনো কাজ শুরু হয়নি বলে জানান তিনি।
এই আতঙ্ক শুধু এহসানুল্লাহর একার নয়, ক্যাম্পগুলোতে অবস্থানরত লাখো রোহিঙ্গা শরণার্থীর মনে এখন এই এক ভয়।
টানা পাঁচ দিন ধরে ভারী বর্ষণে ক্যাম্পগুলোতে পাহাড় ধস, বন্যা ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
চলতি সপ্তাহে বৃষ্টির ফলে পাহাড়ধসে ক্যাম্পগুলোতে অন্তত ১৩ রোহিঙ্গা প্রাণ হারিয়েছেন।
গত বুধবার ক্যাম্প-৬ এর একটি মাদ্রাসায় পাহাড়ধসে ৪ ছাত্রী ও এক শিক্ষকসহ ৫ জন নিহত হন। এর আগে সোমবার রাতে ৩টি পৃথক পাহাড় ধসের ঘটনায় আরও ৮ রোহিঙ্গা মারা যান।
পাহাড়ের ঢালে বসবাসরত পরিবারগুলো যখন পাহাড় ধসের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন, তখন নিচের দিকের বাসিন্দারা লড়াই করছেন বন্যার সঙ্গে।
ক্যাম্প-৫ এর হেড মাঝি দিল মোহাম্মদ ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ভারী বর্ষণ হলে পাহাড়ের বাসিন্দারা ভয় পায় ধসের, আর আমরা ভয় পাই বন্যার। কোথাও শান্তি নেই।’
ক্যাম্প-৫ এলাকাটি তুলনামূলক সমতল হলেও অবিরাম বৃষ্টিতে ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে, রাস্তা ডুবে গেছে এবং অনেক পরিবার উঁচু স্থানে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
দিল মোহাম্মদ বলেন, ‘ক্যাম্প কর্তৃপক্ষের কিছু জরুরি ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এই ছোট আশ্রয়টুকুই আমাদের শেষ ভরসা। বিপর্যয় এসে আমাদের এটা ছেড়েও চলে যেতে হয়।’
ক্যাম্পের বাসিন্দা হোসেন মিয়া জানান, বৃষ্টির রাতে তিনি পুরো সময় জেগেই থাকেন। ‘রাতে পুরো সময় দুশ্চিন্তায় থাকি কখন আবার পাহাড়ধসের খবর আসে কিংবা কখন ঘরে বন্যার পানি ঢুকে যায়। বেশি চিন্তা সন্তানদের নিয়ে,’ বলেন তিনি।
সাব-মাঝি সাব্বির আহমদ জানান, কাপড়-চোপড়, খাবার এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাঁচাতে অনেক পরিবার সেগুলো উঁচুতে তুলে রাখেন। আবার অনেকে নিরাপদ স্থানে থাকা আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে রাত কাটাচ্ছেন।
কুতুপালং, মধুরছড়া, লম্বাশিয়া ও বালুখালী ক্যাম্পের নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হয়েছে বন্যার পানিতে। এতে দোকানপাটের ক্ষতি হয়েছে এবং দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে। রাস্তাগুলো কাদা ও পিচ্ছিল হয়ে যাওয়ায় নারী, শিশু ও বয়স্কদের চলাচল খুব কঠিন হয়ে পড়েছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্য অনুযায়ী, ৮৪ হাজার ৩৮১ পরিবারের প্রায় ৩ লাখ ৭১ হাজার ৩৩৪ রোহিঙ্গা বন্যা ও পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছেন।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমের আগেই আমরা স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরু করেছিলাম। তবে গত ২ বছরে যে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা এসেছেন, তাদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ জমির সংস্থান আমরা করতে পারিনি।’
তিনি জানান, অনেকের ক্ষেত্রে খাড়া পাহাড়ের ঢালে এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে ঘর তৈরি করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।
‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপদ জমির অভাব। এই সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক পরিবার এখনো সার্বক্ষণিক পাহাড়ধসের ঝুঁকির মধ্যে বাস করতে বাধ্য হচ্ছে,’ বলেন তিনি।
ক্যাম্পের লার্নিং সেন্টার ও কমিউনিটি সেন্টারগুলোকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে জানিয়ে মিজানুর রহমান বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য বারবার মাইকিং করলেও অনেকেই ঘর ছাড়তে অনীহা প্রকাশ করছেন।’
এদিকে, গত বৃহস্পতিবার মাদ্রাসায় পাহাড় ধসে এবং কক্সবাজারের সাম্প্রতিক পাহাড় ধস ও আকস্মিক বন্যায় নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর।
বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি আইভো ফ্রাইসেন ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক এই প্রাণহানি বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত ১২ লাখ রোহিঙ্গার অরক্ষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিকে আবার সামনে এনেছে।’
তিনি জানান, তহবিলের ঘাটতির কারণে পর্যাপ্ত জমির অভাব, পাহাড়ের ঢাল ঠিক করা, নিরাপদ অবকাঠামো তৈরি এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে মানবিক সংস্থাগুলোকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার চেয়ে স্বল্পমেয়াদি জরুরি সহায়তার ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।
ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় আরও বেশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, অতিরিক্ত জমি বরাদ্দ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আহ্বান জানান ফ্রাইসেন।
এদিকে কক্সবাজারের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান ডেইলি স্টারকে জানান, গত রোববার ভোর ৬টা থেকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত জেলায় ৬০৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ আরও ২-৩ দিন, অর্থাৎ ১১ জুলাই পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।’
রোহিঙ্গা কোঅর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্মের (আরসিপি) তথ্য অনুযায়ী, ৪ থেকে ৮ জুলাইয়ের মধ্যে ভারী বর্ষণ ও ঝোড়ো হাওয়ার কারণে ক্যাম্পগুলোতে দুর্যোগজনিত ২২৪টি ঘটনা ঘটেছে। এতে ৪ হাজার ৩৪৪টি পরিবারের ২০ হাজার ৪৪৮ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
এসব ঘটনায় ৩ হাজার ৬৪৮ জন মানুষ সাময়িকভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, প্রায় ২ হাজার ২০০ আশ্রয়কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং স্কুল, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা, রিটেইনিং দেয়াল, রাস্তা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

