ভাসমান হাটের জনপদ: পেয়ারা চাষের পাশাপাশি জনপ্রিয় হচ্ছে আমড়াও

হাবিবুর রহমান, পিরোজপুর

পিরোজপুরের নেছারাবাদে পেয়ারার পাশাপাশি এখন আমড়াও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। উপজেলার আটঘর কুড়িয়ানা ইউনিয়নে গ্রামের পর গ্রামজুড়ে বিস্তৃত বাগানগুলো যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাড়িয়েছে, তেমনি তৈরি করেছে বড় এক অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ।

বর্ষা শুরু হলে এখানকার খালগুলোতে প্রতিদিন ভোরে নৌকায় বসে ঐতিহ্যবাহী ফলের হাট। মূলত এই পেয়ারা ও আমড়া চাষকে কেন্দ্র করেই সচল থাকে এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা আর অর্থনীতির চাকা।

নেছারাবাদে পেয়ারা চাষের ইতিহাস প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো। জনশ্রুতি রয়েছে, এই অঞ্চলের ভদ্রাঙ্ক গ্রামের পূর্ণ মন্ডল নামে এক ব্যক্তি ভারতের বিহার রাজ্যের গয়া জেলায় ভ্রমণে গিয়ে ফেরার সময় কিছু পেয়ারার বীজ সাথে করে নিয়ে আসেন। নিজ গ্রামে সেই বীজ বপন করার মাধ্যমেই মূলত এই এলাকায় পেয়ারা চাষের সূচনা হয়।

পেয়ারা
ছবি: স্টার

অল্প সময়েই ভালো ফলন হওয়ায় পেয়ারা চাষ দ্রুত আশপাশের গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে এটি আটঘর কুড়িয়ানা ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী জলাবাড়ি ইউনিয়ন এবং ঝালকাঠি সদর উপজেলার কীর্ত্তিপাশা ও নবগ্রাম ইউনিয়নেও বিস্তৃত হয়েছে। নিচু জলাভূমি হওয়ায় এই এলাকার কৃষকেরা ‘সর্জান’ পদ্ধতিতে সফলভাবে পেয়ারা উৎপাদন করে চলেছেন।

নিচু এলাকায় কৃষকেরা অন্যান্য ফসল ফলাতে ব্যর্থ হলেও সেখানে খুব ভালোভাবেই উৎপাদিত হচ্ছে সুমিষ্ট এই মৌসুমি ফল। ফলে এক সময়ের পতিত জলাভূমি পরিণত হয়েছে অন্যতম ফল উৎপাদনকারী এলাকায়। এই অঞ্চলে উৎপাদিত পেয়ারার বিশেষ চাহিদা রয়েছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

বর্তমানে এসব এলাকার অধিকাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পেয়ারা চাষ, বাগান পরিচর্যা, পেয়ারা ক্রয়-বিক্রয়, ফল সংগ্রহ কিংবা পরিবহনের সঙ্গে জড়িত। খুব সকাল থেকে শুরু করে চার-পাঁচ ঘণ্টা ধরে ছোট ছোট নৌকায় বাগান থেকে পেয়ারা সংগ্রহের পর সেগুলো স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা ভাসমান হাটে নিয়ে বিক্রি করেন চাষিরা।

নৌকায় পেয়ারা ও আমড়া
ছবি: স্টার

নেছারাবাদ ও ঝালকাঠি সদর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, নেছারাবাদ উপজেলায় বর্তমানে ১ হাজার ৩৮৪ জন কৃষক প্রায় ৬০০ হেক্টর জমিতে পেয়ারা চাষ করছেন। এ ছাড়া ঝালকাঠি সদর উপজেলায় ২৯৫ হেক্টর জমিতে পেয়ারা উৎপাদন করছেন প্রায় তিন হাজার কৃষক। গত বছর হেক্টর প্রতি পেয়ারার গড় উৎপাদন ছিল প্রায় সাড়ে নয় টন।

গত এক দশকে পেয়ারার পাশাপাশি আমড়া চাষ এ এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। মৌসুমি এই ফলের ভালো ফলন ও ভালো দাম পাওয়ার কারণে প্রতিবছরই চাষ বাড়ছে। ফলে পেয়ারার পাশাপাশি আমড়া চাষও এই দুই উপজেলার অর্থনীতিতে জায়গা করে নিচ্ছে।

বর্তমানে নেছারাবাদ উপজেলায় ২৯৫ হেক্টর জমিতে ৩ হাজার ৩৮৯ জন কৃষক এবং ঝালকাঠি সদর উপজেলায় ১৬০ হেক্টর জমিতে ৯০০ জন কৃষক আমড়া উৎপাদন করছেন। গত বছর দুই উপজেলায় হেক্টর প্রতি আমড়ার গড় উৎপাদন ছিল ১০ টন।

পেয়ারা
ছবি: স্টার

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা বীজ থেকেই তারা পেয়ারার চারা উৎপাদন করেন। প্রতি বিঘা জমিতে তারা ১০০টি চারা রোপণ করতে পারেন। দেড় বছর বয়সী চারাগুলো রোপণের পাঁচ বছরের মধ্যেই ফল দেওয়া শুরু করে। দীর্ঘ সময় ধরে ফলন দিলেও পেয়ারা গাছ খুব কম জায়গা দখল করে। এ ছাড়া জলমগ্ন জমিতেও অনায়াসেই টিকে থাকতে পারে পেয়ারা গাছ।

তবে আমড়া চাষের পদ্ধতি কিছুটা ভিন্ন। আমড়া গাছ বেশি জায়গা দখল করে, তাই পেয়ারা গাছের তুলনায় কম ঘনত্বে এর চারা রোপণ করতে হয়। প্রতি বিঘা জমিতে ছয় মাস বয়সী সর্বোচ্চ ৫০টি চারা রোপণ করা যায়, যা পরবর্তী তিন বছরের মধ্যেই ফল দিতে শুরু করে। এরপর টানা সর্বোচ্চ ৫০ বছর পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। একটি পরিপক্ব গাছ থেকে বছরে ১০-১২ মণ আমড়া পাওয়া সম্ভব।

আটঘর গ্রামের রথিন মিস্ত্রি জানান, তাদের গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে পেয়ারা ও আমড়া চাষের সঙ্গে যুক্ত। ওই এলাকার মানুষের কাছে এই দুটি ফলই উপার্জনের প্রধান উৎস।

নৌকায় পেয়ারা
ছবি: স্টার

প্রবীণ কৃষক মাখন লাল মজুমদার পুরোনো স্মৃতিচারণ করে বলেন, প্রায় পাঁচ দশক আগে তারা সংখ্যা গুনে পেয়ারা বিক্রি করতেন; কিন্তু বর্তমানে পেয়ারা ওজন করে বিক্রি হয়। তিনি আরও জানান, তখন পেয়ারার উৎপাদন প্রচুর থাকলেও দাম ছিল খুবই কম। এমনকি ক্রেতার অভাবে মাঝেমধ্যে অবিক্রীত পেয়ারা খালের পানিতে ভাসিয়ে দিতে হতো।

তবে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় চাষিদের এখন আর আগের মতো কেবল জলপথের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে না। উন্নত সড়ক ব্যবস্থার কারণে বর্তমানে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানে করে এখানকার পেয়ারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

অন্যদিকে, পেয়ারা চাষের দীর্ঘ ঐতিহ্য থাকলেও অধিক লাভের আশায় অনেক কৃষকই এখন পেয়ারা থেকে আমড়া চাষের দিকে ঝুঁকছেন। স্থানীয় চাষি পলাশ দেউড়ী জানান, এক বিঘা জমি থেকে বছরে যেখানে সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকার পেয়ারা বিক্রি করা যায়, সেখানে একই জমি থেকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার আমড়া বিক্রি করা সম্ভব।

নৌকায় পেয়ারা ও আমড়া
ছবি: স্টার

মূল্য ও সংরক্ষণের দিক থেকেও আমড়া বেশি সুবিধাজনক। এক মণ পেয়ারা সর্বোচ্চ ৮০০ টাকায় বিক্রি হলেও ভরা মৌসুমে এর দাম  কমে যায়। এ ছাড়া পেয়ারা দ্রুত পচনশীল; পরিপক্ব হওয়ার পর দ্রুত বাগান থেকে সংগ্রহ করা না হলে তা ঝরে পড়ে এবং সংগ্রহের পর খুব বেশি দিন সংরক্ষণ করা যায় না।

এর বিপরীতে, এক মণ আমড়া ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হয় এবং আমড়া পরিপক্ব হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় গাছে রেখে সুবিধামতো বিক্রি করা যায়। পাশাপাশি গত কয়েক বছর ধরে পেয়ারার ফলন কিছুটা কমেছে, যার ধারাবাহিকতা এ বছরও বজায় রয়েছে।

স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, পেয়ারা বাগানের আগাছা দমনে কোদাল ও নিড়ানির পরিবর্তে অনেক চাষি এখন রাসায়নিক আগাছানাশক ব্যবহার করছেন। মূলত এই রাসায়নিকের প্রভাবেই পেয়ারার উৎপাদন কমে গেছে বলে তারা মনে করছেন।

আমড়া চাষ
ছবি: স্টার

তবে অনেক কৃষক মনে করছেন, এই বছর পেয়ারার দামও ভালো। ভালো দাম থাকলে পেয়ারা চাষে আগ্রহ কমবে না। বরং এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে পেয়ারা ও আমড়া সমানতালে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

নেছারাবাদ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, পেয়ারার তুলনায় আমড়া চাষ কয়েক গুণ বেশি লাভজনক হওয়ায় এ ফলের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে। তবে গত কয়েক বছর ধরে চাষিরা পেয়ারারও বেশ ভালো দাম পাচ্ছেন।

বাগানে আগাছা দমনে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ব্যবহারের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, কৃষি বিভাগ সবসময়ই কৃষকদের কোদাল বা অন্যান্য কৃষি যন্ত্রপাতির সাহায্যে নিজ হাতে আগাছা পরিষ্কার করার পরামর্শ দিয়ে থাকে।