২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন এনইসিতে
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি) অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা, অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ, সামাজিক সুরক্ষা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু-সহনশীল উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য আজ সোমবার ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন দিয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য নতুন এই এডিপি টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন ও প্রশাসনিক আধুনিকীকরণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি সংস্কারমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রণয়ন করা হয়েছে।
এনইসি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর শেরে-বাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত নতুন সরকারের অধীনে প্রথম এনইসি বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।
বৈঠক শেষে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।
ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি এবং পরিকল্পনা সচিব এস এম শাকিল আখতার উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট সচিবরা অংশ নেন।
বৈঠকে আগামী পাঁচ বছরের জন্য প্রণয়নাধীন একটি কৌশলগত আর্থিক পরিকল্পনা কাঠামোর নীতিগত অনুমোদনও দেওয়া হয়, যা সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) অধীনে একটি উপদেষ্টা কমিটি প্রস্তুত করছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত এডিপির আকার ধরা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা, যার মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে এবং ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে আসবে।
এডিপির আকার চলতি অর্থবছরের তুলনায় বেশি, যা সরকারের বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার উন্নতি নির্দেশ করে।
নতুন এডিপিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ১ হাজার ২৭৭টি নতুন প্রকল্পের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে (পিপিপি) ৮০টি প্রকল্প এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের আওতায় ১৪৮টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
মন্ত্রণালয় জানায়, কর্মসূচিটি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ ও জলবায়ু অভিযোজন উদ্যোগে জোরালো গুরুত্বের প্রতিফলন।
এডিপিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয় বাস্তবায়নের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় উন্নত সক্ষমতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
১৫টি খাতের মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে।
এ ছাড়া, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা কর্মসূচির জন্য ১৭ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
নতুন অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর একটি বড় অংশ বৈদেশিক অর্থায়ননির্ভর, যা বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থার প্রতিফলন।
বৈঠকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকা প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং মেয়াদোত্তীর্ণ প্রকল্পে নতুন ব্যয় সীমিত করার কথা বলা হয়েছে, যাতে উন্নয়ন ব্যয় আরো কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক হয়।
সংশোধিত এডিপির তুলনায় নতুন এডিপির আকার ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় সম্পদ থেকে বরাদ্দ ৪৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং বৈদেশিক অর্থায়ন ৫২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
নতুন এডিপিতে দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন, সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন, পর্যটন, নীল অর্থনীতি, সবুজ প্রবৃদ্ধি এবং খাতভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলেন, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও করপোরেশনের স্ব-অর্থায়িত প্রকল্পগুলো অন্তর্ভুক্ত করলে মোট এডিপির আকার দাঁড়াবে ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ দশমিক ৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৯২৩ দশমিক ৯৩ কোটি টাকা সরকারি ও নিজস্ব উৎস থেকে এবং ১ লাখ ১০ হাজার দশমিক ৯০ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে আসবে।
কর্মসূচিতে ৯৭১টি বিনিয়োগ ও জরিপ প্রকল্পে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯১৪ দশমিক ৬৩ কোটি টাকা এবং ১০৭টি কারিগরি সহায়তা প্রকল্পে ২ হাজার ৭৯৬ দশমিক ২৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
এ ছাড়া, ‘বিশেষ উন্নয়ন সহায়তা’ ব্লক বরাদ্দ হিসেবে ৩৮ হাজার ২৭ দশমিক ৪৯ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে এবং সামাজিক উন্নয়ন সহায়তার জন্য আরও ১৭ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে।
নতুন এডিপিতে খাতভিত্তিক বরাদ্দের মধ্যে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত সর্বোচ্চ ৫০ হাজার ৯২ দশমিক ৫৩ কোটি টাকা বা মোট এডিপির ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ পেয়েছে।
শিক্ষাখাত পেয়েছে ৪৭ হাজার ৫৯১ দশমিক ১২ কোটি টাকা বা ১৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ; স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ৩৫ হাজার ৫৩৫ দশমিক ৫০ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ১১ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিখাতে বরাদ্দ হয়েছে ৩২ হাজার ৬৯১ দশমিক ৫৪ কোটি টাকা বা ১০ দশমিক ৯০ শতাংশ; গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধা খাতে বরাদ্দ ২০ হাজার ৩৬১ দশমিক ৭২ কোটি টাকা বা ৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ।
এই পাঁচ খাতই মোট ক্ষেত্রভিত্তিক বরাদ্দের ৬২ শতাংশের বেশি।
মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ সর্বোচ্চ ৩৩ হাজার ৭৩৫ দশমিক ১০ কোটি টাকা বা ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ বরাদ্দ পেয়েছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ ৩০ হাজার ৭৪১ দশমিক ৩৬ কোটি টাকা বা ১০ দশমিক ২৫ শতাংশ; স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ২৬ হাজার ৮০৬ দশমিক ২৬ কোটি টাকা।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ ২০ হাজার ৮৩৫ দশমিক ৪৪ কোটি টাকা বা ৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ; প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ১৯ হাজার ৪৪০ দশমিক ৫৯ কোটি টাকা বা ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ বরাদ্দ পেয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ পেয়েছে ১৪ হাজার ৯৩৮ দশমিক ৬৬ কোটি টাকা বা ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
এ ছাড়া, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ১৭ হাজার ৪০৩ দশমিক ৭৪ কোটি টাকা, স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ৮ হাজার ২২০ দশমিক ৮৫ কোটি টাকা, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ৮ হাজার ২০৬ দশমিক ৫৩ কোটি টাকা এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ও উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ পেয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন এসডিজি, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাপ), জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি), সবুজ জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন কৌশল (জিসিআরডি) এবং ডেল্টা অ্যাপ্রাইজাল ফ্রেমওয়ার্কের (ডিএএফ) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করেছে।
যেসব প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়ন নিশ্চিত, পিপিপি উদ্যোগ, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো ও সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন রয়েছে, সেগুলোকেও অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ সময়কালে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকার বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৭৫ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরে সম্পন্ন হওয়ার জন্য চিহ্নিত ২৬টি প্রকল্প পরবর্তী অর্থবছরে বহন করা হবে।