ব্যাংক থেকে আরও ৫০০০ কোটি টাকা ঋণ নিতে যাচ্ছে সরকার
সরকার ব্যাংক খাত থেকে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, আগামী ৮ এপ্রিল ৯১ দিনের ট্রেজারি বিলের বিশেষ নিলামের মাধ্যমে এই টাকা সংগ্রহ করা হবে।
এ নিয়ে এক সপ্তাহের একটু বেশি সময়ের মধ্য নতুন সরকার দ্বিতীয়বারের মতো এই বিশেষ ঋণ নিচ্ছে। সরকারের ঋণ বেশি নেওয়ার কারণ হলো, খরচ বাড়ছে কিন্তু আয় (রাজস্ব) বাড়ছে না।
কর্মকর্তাদের মতে, জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি তেল কেনা হয়েছে, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষি ঋণ মওকুফের মতো নতুন সামাজিক কর্মসূচিতেও বাজেট খরচ বেড়েছে। তাছাড়া সরকারি খরচগুলো সাধারণভাবেই বাড়ছে। এসব কারণে সরকারের ওপর খরচের চাপ বেড়েছে।
এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নির্বাচনী খরচে রাষ্ট্রের তহবিল কমেছে।
অন্যদিকে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আট মাসে তাদের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৮ শতাংশ কম রাজস্ব আদায় করেছে, এতে প্রায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরকার ইতোমধ্যে ১ এপ্রিল একইভাবে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। নিয়মিত ঋণের সঙ্গে এই দুইবারের ঋণ মিলিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণের সীমা ছাড়িয়ে যাবে।
গত বছরের জুলাই থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার ও নতুন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ৩ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ, অথচ অর্থবছরের এখনও প্রায় তিন মাস বাকি।
এক বছর আগে একই সময়ে ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২৭ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা।
এ অর্থবছরে এ পর্যন্ত নেওয়া ঋণের মধ্যে ১৭ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এসেছে, ৭১ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে এবং ৯ হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে নেওয়া হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট অনুযায়ী, ব্যাংকবহির্ভূত ও বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা যথাক্রমে ২১ হাজার কোটি টাকা এবং ৯৬ হাজার কোটি টাকা নির্ধারিত ছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ নিলে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ে। তবে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকগুলো সরকারকে সহজেই ঋণ দিচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি জানুয়ারিতে নেমে এসেছে ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ৬ দশমিক ০৩ শতাংশে, যা ফেব্রুয়ারিতেও একই ছিল।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারের যখন বেশি টাকার প্রয়োজন পড়ে, তখন বিশেষ ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ঋণ নেয়। দুর্বল রাজস্ব আদায়ও এর একটি কারণ হতে পারে।’
সরকার সাধারণত বাজেট ঘাটতি পূরণ ও খরচ চালাতে ট্রেজারি বিল (স্বল্পমেয়াদি) ও বন্ড (দীর্ঘমেয়াদি) বিক্রি করে। এগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা হয় এবং এগুলোকে কম ঝুঁকির বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হয়।
এখন ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ প্রায় লক্ষ্যমাত্রা ছুঁয়ে ফেলেছে এবং অর্থবছর এখনও শেষ হয়নি, তাই অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, এতে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে, বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যেতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।