মধ্যপ্রাচ্যে খাদ্য রপ্তানিতে যুদ্ধের ধাক্কা, কমছে ক্রয় আদেশ

জাগরণ চাকমা
জাগরণ চাকমা
সুকান্ত হালদার
সুকান্ত হালদার

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোতে বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও কৃষিপণ্য রপ্তানি ধাক্কার মুখে পড়েছে। চলমান যুদ্ধের প্রভাবে পণ্য পরিবহন খরচ চার গুণ বেড়েছে। পাশাপাশি নতুন ক্রয় আদেশও কমেছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের আগে এক কনটেইনার প্রক্রিয়াজাত খাদ্য পাঠাতে খরচ হতো প্রায় ১ হাজার ৫০০ ডলার। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর পণ্য রপ্তানিতে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে, ফলে পরিবহন খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ ডলারে।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান খান চৌধুরী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের বাজার থেকে ক্রয় আদেশের পরিমাণও যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে।’

উপসাগরীয় দেশগুলোতে বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ। এই তালিকায় আছে—মসলা, বিস্কুট, মুড়ি, চানাচুর, নুডলস, সরিষার তেল, পানীয় এবং নাশতাসামগ্রী। এসব পণ্যের প্রধান ক্রেতা হলো ওই অঞ্চলে বসবাসকারী বাংলাদেশি প্রবাসীরা।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই বাজারের আকার ১০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। প্রধান রপ্তানি গন্তব্যগুলোর মধ্যে আছে—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইন।

আহসান খান চৌধুরী জানান, আগে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পণ্য পাঠানো হতো পাঁচ থেকে ছয়টি বন্দর দিয়ে।

তিনি বলেন, ‘কিন্তু হরমুজ প্রণালী বন্ধ এবং অন্যান্য বন্দরে পাল্টা হামলার কারণে এখন রপ্তানিকারকদের হাতে কার্যত কেবল জেদ্দা বন্দরই খোলা আছে। পরিবহন খরচ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত এই সৌদি বন্দরের ওপর বাড়তি চাপ।’

তিনি আরও জানান, এই সমস্যাগুলোর পাশাপাশি এখন মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে পণ্য পাঠাতে আগের তুলনায় বেশি সময় লাগছে।

তিনি মন্তব্য করেন, ‘এখনো কারখানার উৎপাদনে প্রভাব পড়েনি, তবে বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে খুব শিগগিরই উৎপাদন কমানো অনিবার্য হয়ে উঠবে।’

বোম্বে সুইটস অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের আন্তর্জাতিক বিপণন ব্যবস্থাপক রেজাউল হক খন্দকার জানান, যুদ্ধের জন্য তারা ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রীক রপ্তানির জন্য পণ্য উৎপাদন বন্ধ রেখেছেন।

পারটেক্স স্টার গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ড্যানিশ ফুডস লিমিটেডের বিজনেস প্রধান সাইদুল আজহার সারওয়ার বলেন, পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে এক ধরনের ‘যুদ্ধ খরচ’ যুক্ত হয়েছে, যা মোট খরচের পরিমাণ বাড়িয়েছে।

তিনি বলেন, ‘খরচ বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকারকেরা পণ্য নিতে অনীহা দেখাচ্ছেন। বিশেষ করে যেসব পণ্য ইতোমধ্যে পথে আছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’

তার মতে, মোট ব্যয় অন্তত ১৫ শতাংশ বেড়েছে। এতে অনেক ক্রেতাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশায় অর্ডার পিছিয়ে দিচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে চাকরির অনিশ্চয়তা বাড়তে শুরু করেছে। এ কারণে তাদের কাছে অপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের চাহিদা কমতে পারে।

সিটি গ্রুপের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর লুৎফুল কবির শাহীন জানান, শিপমেন্টের সময়সূচি এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রেও পণ্য পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে এবং ট্রানজিট সময় প্রায় ১০ দিন পর্যন্ত বেড়ে গেছে।

তবে তিনি বলেন, উৎপাদন মোটামুটি ঠিক আছে। কোম্পানিগুলো নতুন নতুন পথ ব্যবহার করছে, যেমন দুবাই হয়ে পণ্য পাঠানো। খাদ্যপণ্যের চাহিদা ঠিকই আছে, কিন্তু রপ্তানি প্রক্রিয়া এখন আগের চেয়ে বেশি জটিল হয়ে গেছে, তাই কাজ করতে বাড়তি পরিকল্পনা ও নমনীয়তা দরকার হচ্ছে।

সিটি গ্রুপের মতোই, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের রপ্তানি প্রধান সামিরা রহমান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের জন্য তাদের উৎপাদন এখনো স্বাভাবিক রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের কারখানার কাজ ঠিকমতো চলছে। সব কিছু পরিকল্পনা করে এবং ঠিকভাবে সরবরাহ ব্যবস্থা চালিয়ে আমরা কাজ করছি। তবে পণ্য পাঠানোর (লজিস্টিকস) সমস্যা এখনো আছে।’

তিনি আরও বলেন, অনেক শিপিং কোম্পানি নতুন অর্ডার নিচ্ছে না, এমনকি আগের অর্ডারও বাতিল করছে। এতে পণ্য পাঠানোর সময়সূচি ঠিক রাখা যাচ্ছে না, আর ঝুঁকির কারণে খরচও বাড়ছে।

তার ভাষ্য, ‘যুদ্ধের ঝুঁকির কারণে অতিরিক্ত চার্জ যোগ হওয়ায় কিছু রুটে—যেমন ওমানে পণ্য পাঠাতে খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।’

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি থেকে বছরে প্রায় ৪০–৪৫ মিলিয়ন ডলার আয় হয়। আর ২০২৪–২৫ অর্থবছরে কৃষিখাত থেকে মোট আয় হয়েছে ৬৫ দশমিক ২৪ মিলিয়ন ডলার।