৩৪ জুলাই: ‘দফা এক, দাবি এক, শেখ হাসিনার পদত্যাগ’

আব্দুল্লাহ আল আমীন
আব্দুল্লাহ আল আমীন

২০২৪ সালের ৩ আগস্ট। একদিকে চলছে ছাত্র-জনতা হত্যা; অন্যদিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিলেন, আলোচনা করতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের জন্য গণভবনের দরজা খোলা। কিন্তু সেই ফাঁদে পা দেয়নি শিক্ষার্থীরা। ঘোষণা করে এক দফা।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা ৩ আগস্ট রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক বিশাল সমাবেশে স্বৈরাচারী হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পদত্যাগে এক দফা দাবি ঘোষণা করেন।

204.png
ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে হাজারো বিক্ষোভকারী। ছবি: নাইমুর রহমান/স্টার

ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদি থেকে সামনের গোটা চত্বর ও সড়ক সেদিন ছিল লোকে লোকারণ্য। সর্বত্র শুধু মানুষ আর মানুষ। বৃষ্টি উপেক্ষা করে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের স্রোত সেদিন মিশেছিল শহীদ মিনারে। নারী-পুরুষ সবার কণ্ঠে একই সুর—সরকার পতনের এক দফা।

আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়কারী নাহিদ ইসলাম সেদিন বিকেল ৫টার দিকে হাসিনার সংলাপের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে এক দফার ঘোষণা দেন।

এর আগে সকালে হাসিনা গণভবনে পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে বলেন, 'গণভবনের দরজা খোলা। আমি আন্দোলনরত ছাত্রদের সঙ্গে বসতে চাই এবং তাদের কথা শুনতে চাই। আমি কোনো সংঘাত চাই না।'

এই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে নাহিদ বলেন, 'মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা এক দফা দাবির সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি। দফাটি হলো, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ এই সরকারের পতন ও ফ্যাসিবাদের বিলোপ।'

তারা আন্দোলনের সময় সব হত্যাকাণ্ড ও অপহরণের জন্য হাসিনার বিচারের দাবিও জানান।

উপস্থিত ছাত্র-জনতা 'আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে', 'জাস্টিস জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস', 'দিয়েছি তো রক্ত, আরও দেব রক্ত', 'স্বৈরাচারের গদিতে আগুন জ্বালো একসাথে', 'বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর', 'পদত্যাগ পদত্যাগ, শেখ হাসিনার পদত্যাগ', 'দফা এক, দাবি এক, শেখ হাসিনার পদত্যাগ' স্লোগানে মুখরিত করে তোলেন সমাবেশস্থল।

আন্দোলনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) তৎকালীন প্রধান নির্বাহী এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ছাত্র-জনতার প্রচণ্ড ক্ষোভ থেকেই এক দফার কর্মসূচি এসেছে। মানুষের বুকের ওপর গুলি করা হয়েছে। প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সব মানুষ নেমে এসেছেন। জনদ্রোহের মাধ্যমেই এমন সরকারের শেষ পরিণতি নির্ধারিত হয়।

১৮ জুলাই গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর স্মরণে শিক্ষার্থীদের অনেকে 'পানি লাগবে, পানি লাগবে' বলে বিনামূল্যে পানি বিতরণ করেন।  এমন নানা স্লোগান দিতে থাকেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

রিকশাচালকেরাও শহীদ মিনারের পাশে অবস্থান নিয়ে স্লোগান দেন 'রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়'।

200.png
ছবি: সাদী মুহাম্মাদ আলোক/স্টার

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সমাবেশ থেকে 'সর্বাত্মক অসহযোগে'র ঘোষণায় ১৫ দফা দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ বলেন, কর বা খাজনা দেওয়া হবে না; বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, পানির বিলসহ কোনো ধরনের বিল পরিশোধ করা হবে না; সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত ও কলকারখানা বন্ধ থাকবে; কেউ অফিসে যাবে না, কিন্তু মাস শেষে বেতন নেবে; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে; প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স দেবেন না।

৩ আগস্ট সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান রাজধানীর সেনা সদরদপ্তরে হেলমেট অডিটোরিয়ামে সেনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ভাষণে বলেন, জনগণের স্বার্থে এবং রাষ্ট্রের যেকোনো প্রয়োজনে সেনাবাহিনী সব সময় জনগণের পাশে আছে ও থাকবে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাইবার সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন গুজব ও অপপ্রচার চালাচ্ছে। দেশবিরোধী একটা মহল চলমান সংকট জিইয়ে রেখে ফায়দা তোলার চেষ্টা করছে। যারা বাংলাদেশকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করতে এবং দেশকে খাদের কিনারায় নিয়ে যেতে চায়, এ অশুভ শক্তির তৎপরতা আমরা সফল হতে দিতে পারি না।

ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া অঙ্গরাজ্যে ‘স্নিকার কন’ নামে এক সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সময় ডায়াসের ওপর এক জোড়া সোনালি রঙের জুতা রাখেন এবং ‘ট্রাম্প স্নিকার’ বাজারে আনার ঘোষণা দেন। ছবি: ডয়চে ভেলে/ম্যানুয়েল বলচে চেনেতা/এপি ফটো/পিকচার অ্যালায়েন্স
বাড্ডা, রামপুরা ও বনশ্রী এলাকা থেকে শহীদ মিনারের অভিমুখে মিছিল। ছবি: আসিফুর রহমান/স্টার

তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, আন্দোলনকারীরা সেই কোটা আন্দোলনে নেই, ছাত্রদের আন্দোলনে নেই, এখন রাজনৈতিক আন্দোলনে চলে গেছে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'আপনাকে যদি মারে, তাহলে আপনি কি মার দেবেন না? আপনি কি বসে থাকবেন? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আত্মরক্ষার অধিকার দেওয়া আছে। আপনাকেও দেওয়া আছে। আপনাকে যদি কেউ আক্রমণ করে, আপনার প্রাণ রক্ষার্থে, সম্পদ রক্ষার্থে আত্মরক্ষায় যেতে পারেন।'

এক সাংবাদিক পুলিশের গুলিতে সাংবাদিকদের নিহত হওয়ার প্রসঙ্গে তুললে তিনি বলেন, 'না, না, এ আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে কেউ মারা যায়নি।'

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ দিন বলেন, 'ছাত্র আন্দোলনে গণজাগরণ শুরু হয়ে গেছে এবং আন্দোলন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে গেছে।'

চট্টগ্রামে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর বাসভবনে হামলা হয় এবং বাসার সামনে পার্ক করে রাখা দুটি গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। চট্টগ্রাম-১০ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চুর লালখান বাজারে অবস্থিত কার্যালয়েও হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

204.png
ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে হাজারো বিক্ষোভকারী। ছবি: নাইমুর রহমান/স্টার

এ দিন সকাল থেকেই বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রীসহ রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। শিক্ষার্থীরা বিকেলে সায়েন্সল্যাব মোড় ও মিরপুর রোড অবরোধ করেন। মিরপুর-১০ গোলচত্বরে হাজারো শিক্ষার্থী বিক্ষোভ করেন। রাজধানীর বাইরে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে যায় এবং দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক অবরোধ করে রাজধানীর সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

কুমিল্লা শহরের পুলিশ লাইনস এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মীরা গুলি চালালে অন্তত সাত জন গুলিবিদ্ধ হন।

চট্টগ্রামে লোহাগড়া থানায় হামলা হয়। গাজীপুরের শ্রীপুরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে একজন নিহত হন। বগুড়ায় বি‌ক্ষোভ কর্মসূচি চলাকা‌লে পু‌লি‌শের সঙ্গে আন্দোলনকারী‌দের সংঘর্ষের ঘটনায় পু‌লিশ টিয়ার‌শেল ও রাবার বু‌লেট ছোড়েসিলেট নগরীর চৌহাট্টা এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বৃষ্টি উপেক্ষা করে চাঁদপুরকুষ্টিয়ায় বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। নারায়ণগঞ্জে মিছিলের পর শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন কণ্ঠশিল্পী, ব্যান্ডদল ও গীতিকার-সুরকাররা।

এ দিন পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে হাসিনা আশ্বাস দেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার অবশ্যই করা হবে।

এর প্রতিক্রিয়ায় দ্য ডেইলি স্টারকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, 'হত্যাকারী কীভাবে নিজের বিচার করবে।'