প্রধান কয়েকটি বাজার বন্ধ: স্থবির হয়ে আছে বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসন
মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বেশ কয়েকটি প্রধান শ্রমবাজারে বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানো কয়েক বছর ধরে স্থবির হয়ে আছে। এর ফলে হাজারো বিদেশ গমনেচ্ছু শ্রমিক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
শুধু মালয়েশিয়া বা আমিরাত নয়, ওমান ও বাহরাইনও বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রবেশ বন্ধ বা সীমিত রেখেছে, যা পুনরায় চালুর কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। এ কারণে বাংলাদেশ এখন পুরোপুরি সৌদি আরবের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সৌদি আরব প্রায় ৩০ লাখ বাংলাদেশি কর্মীকে নিয়োগ দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলতে পারে। সংঘাত বাড়লে উপসাগরীয় দেশগুলোতে শ্রমিক নিয়োগ কমে যেতে পারে, যার ফলে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বিদেশের শ্রমবাজার আরও ছোট হয়ে আসবে।
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ১১ দশমিক ৩১ লাখ বাংলাদেশি কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশ গেছেন। তাদের মধ্যে ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৬৭১ জন বা ৬৬ দশমিক ৭২ শতাংশেরই গন্তব্য ছিল সৌদি আরব।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় এসেছে, যার মধ্যে ৪ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার বা ১৪ শতাংশ এসেছে সৌদি আরবে কর্মরত অভিবাসী কর্মীদের কাছ থেকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি মাত্র বাজারের ওপর এমন অতি-নির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার পেছনে বেশ কিছু মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে—অভিবাসন প্রক্রিয়ায় প্রতারণা, আগ্রাসী নিয়োগ প্রক্রিয়া, ভিসার জন্য ঘুষ লেনদেন ও সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ।
মালয়েশিয়া: কোনো অগ্রগতি নেই
২০২১ সালে মালয়েশিয়া তাদের শ্রমবাজার পুনরায় খুলে দেওয়ার পর ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিলের মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী দেশটিতে গেছেন।
তবে ১৮ হাজারেরও বেশি কর্মী যাত্রার ডেডলাইন মিস করেছেন এবং বর্তমানে তারা আটকে আছেন।
ক্ষমতা নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করে এবং তাদের নিয়োগ কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার অনুরোধ জানায়। মালয়েশিয়া সফরকালে তৎকালীন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছিলেন, দেশটি বাংলাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক কর্মী নিয়োগ করবে।
বিপরীতে, মালয়েশিয়া এখন কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে ১০টি কঠোর শর্ত আরোপ করেছে।
২০২৪ সালের অক্টোবরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের ঢাকা সফরসহ বেশ কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে কেবল আশ্বাসই মিলেছে, কোনো সুনির্দিষ্ট বা কার্যকর ফলাফল আসেনি।
মানিকগঞ্জের খিজির ইসলাম নামে এক আটকে পড়া কর্মী তার হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা গত কয়েক মাস ধরে কেবল আশ্বাসের কথাই শুনছি। আমরা আর কতদিন এভাবে অপেক্ষা করব?’
সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিধিনিষেধ
মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০১৩ সাল থেকেই মূলত বন্ধ হয়ে আছে। তবে বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ১২ লাখ বাংলাদেশি কর্মী কাজ করছেন।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে দেশটিতে অবস্থানরত কিছু অভিবাসী বিক্ষোভ করার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে কর্মসংস্থান ও ভ্রমণ (ভিজিট) উভয় ধরনের ভিসার ওপরই কড়াকড়ি আরোপ করে।
গত বছর দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড গভর্নমেন্টস সামিট’—এ তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস আরব আমিরাতের মন্ত্রীদের এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তবে এরপর আর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, গত বছর কোনো ভিজিট বা ওয়ার্ক ভিসা ইস্যু করা হয়নি। যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, দেশটিতে এখনো বিধিনিষেধ বহাল রয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে যেতে ইচ্ছুক অনেক কর্মীই এখন আশা হারাচ্ছেন। তাদেরই একজন খুলনার আব্দুল হাশিম।
এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘আমি এক বছরেরও বেশি সময় আগে পাসপোর্ট জমা দিয়েছি। কিন্তু আমার ওয়ার্ক ভিসার আবেদন এখনো প্রসেস করা হয়নি।’
সংকুচিত হচ্ছে শ্রমবাজার
গত এক দশকে ওমান, বাহরাইন, মালদ্বীপ, লিবিয়া ও ব্রুনাই বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য তাদের শ্রমবাজার বন্ধ রেখেছে।
কাগজপত্র জালিয়াতি এবং ভিসার শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ওমান কর্মী নিয়োগ স্থগিত করে। অন্যদিকে, নানা অনিয়মের অজুহাতে মালদ্বীপও ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দেয়।
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, এই বাজারগুলো কেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করতে একটি সঠিক গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘চাকরির নিশ্চয়তা ছাড়াই যদি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো কর্মীদের বিদেশে পাঠায়, তবে তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।’
তিনি বিদেশ গমনের আগের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করা এবং কর্মীদের যোগ্যতানুযায়ী সঠিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ ইনিশিয়েটিভস প্রোগ্রামের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর শরিফুল হাসান বলেন, জালিয়াতি, ভিসা ‘বাণিজ্য’ এবং সুশাসনের অভাবে বাংলাদেশের শ্রমবাজার দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা শ্রম চাহিদাকে আরও ব্যাহত করতে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাত যদি ছড়িয়ে পড়ে, তবে এটি আঞ্চলিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মী নিয়োগ কমিয়ে দেবে।’
সৌদি আরবের শ্রমবাজারের ওপর বাংলাদেশের অতি-নির্ভরশীলতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ওই বাজারে কোনো ধরনের বিপর্যয় দেখা দিলে তা বাংলাদেশের শ্রম খাত এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করবে।’
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে বন্ধ থাকা বাজারগুলো পুনরায় চালুর বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, ‘নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফলাফল ছিল শূন্য।’
সরকারের পরিকল্পনা
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, বাহরাইন, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিদেশের শ্রমবাজারগুলো পুনরায় চালুর বিষয়ে সরকার কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের বিষয়ে তিনি বলেন, যেসব কোম্পানি নিয়োগের শর্ত পূরণ করেছে, তাদের একটি তালিকা এরইমধ্যে মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে, তবে তারা এখনো কোনো সাড়া দেয়নি।
তিনি জানান, দক্ষ কর্মী পাঠানোর সুযোগ সম্প্রসারণে সরকার তৎপরতা আরও বাড়াবে। এ প্রসঙ্গে তিনি আগামী পাঁচ বছরে জাপানে এক লাখ কর্মী পাঠানোর একটি চুক্তির কথা উল্লেখ করেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, শুধু একটি বা দুটি দেশের ওপর নির্ভর না করে শ্রমবাজারের গন্তব্যে বহুমুখিতা আনা এবং নিয়োগ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো জরুরি। অন্যথায়, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা আর শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার ফলে বাংলাদেশের প্রবাসী আয় ও কর্মসংস্থান খাত আরও বেশি চাপে পড়বে।