সরেজমিন ইউক্রেন-পোল্যান্ড সীমান্তে

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

গত সপ্তাহে রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসন শুরুর পরপর ইউক্রেন থেকে ৮টি সীমান্ত দিয়ে পোল্যান্ডে প্রবেশ করতে থাকেন শরণার্থীরা। শুধু ইউক্রেনীয়রাই নন, সে দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিসহ অন্যান্য দেশের নাগরিকরাও জীবন বাঁচাতে সীমান্ত এলাকায় জড়ো হন। বাংলাদেশিদের অধিকাংশ মেডিকা, বুদোমিয়ার্স ও ক্রোশচেনকো- এই ৩ সীমান্ত দিয়ে পোল্যান্ডে প্রবেশ করছেন।

গত কয়েকদিনে এ সব সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করেছেন জার্মানভিত্তিক গণমাধ্যম ডয়েচে ভেলের সাংবাদিক আরাফাতুল ইসলাম। তার পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে সীমান্ত এলাকাগুলোর পরিস্থিতি, শরণার্থীদের আগমন ও তাদের জন্য ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো। 

গতকাল বৃহস্পতিবার আরাফাতুল ইসলামের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয় দ্য ডেইলি স্টারের। ইউক্রেন থেকে পোল্যান্ডে প্রবেশ করা বাংলাদেশিদের ব্যবস্থাপনাসহ কিছু বিষয় সম্পর্কে তিনি তার পর্যবেক্ষণ বর্ণনা করেছেন। 

আরাফাত জানান, সীমান্তগুলোতে সাধারণত বর্ডার চেকপোস্ট থেকেই শরণার্থীদের গাড়িতে করে পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশসহ বিভিন্ন শহরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। 

তিনি বলেন, 'মেডিকা সীমান্ত দিয়ে গত কয়েকদিনে পায়ে হেঁটে পোল্যান্ডে ঢুকতে পেরেছেন বাংলাদেশিরা। তবে, এই সীমান্ত থেকে ঠিক কতজন বাংলাদেশি পোল্যান্ডে প্রবেশ করেছেন জানতে পারিনি।'

সংখ্যাটি ৩০০-৫০০ জন হতে পারে বলে পোল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাসের একটি সূত্রের মাধ্যমে আরাফাত নিশ্চিত হয়েছেন বলে জানান।

এই সীমান্তে মঙ্গলবার বাংলাদেশি দূতাবাসের উদ্যোগে একটি বাস দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশিদের জন্য। তারা যেন সীমান্ত অতিক্রম করার পরপরই কিছুটা বিশ্রাম নিতে পারেন এবং খাওয়া-দাওয়ার সুযোগ পান সেটা বাসে নিশ্চিত করা হয়েছিল।

সেখানে ২ বাংলাদেশি নারীসহ বেশ কয়েকজনকে আশ্রয় নিতে দেখেছেন আরাফাত।

bc826caa-f2f8-4b82-ab0f-5f0a2047d24c.jpg
ছবি: ডয়েচে ভেলের সৌজন্যে

তিনি বলেন, 'পরবর্তীতে বাসটি কয়েকজন বাংলাদেশি নিয়ে ওয়ারশ'র উদ্দেশে চলে যায়। সেখানে একটি মাইক্রোবাসও রাখা হয় একই কাজের জন্য। ঘটনাস্থলে কর্মরত বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তা অনির্বাণ নিয়োগী আমাকে জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশিরা যেন সীমান্ত পার হওয়ার পর সেখানে বিশ্রামের সুযোগ পায় সেজন্য পর্যায়ক্রমে বাস ও মাইক্রোবাস সীমান্তে থাকবে'। 

'আমি আজ খোঁজ নিয়ে জেনেছি, সেখানে বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকজন পোল্যান্ড প্রবাসী বাংলাদেশি সীমান্তে নিরলসভাবে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন গত কয়েকদিন ধরে। তারা চেকপোস্টের কাছে গিয়ে বাংলাদেশিদের খুঁজে নিয়ে আসছেন, তাদের পরবর্তী গন্তব্যে পৌঁছে দিতে সহায়তা করছেন,' বলছিলেন আরাফাত।

মেডিকা সীমান্তের সবচেয়ে কাছের শহর শেমিসেল। সীমান্ত থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের এই শহরে আসার পর শরণার্থীরা ট্রেনে ওয়ারশসহ বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি।

আরাফাত বলেন, 'মঙ্গলবার আমি সীমান্ত এলাকায় থাকাকালে একটি সংবাদ শুনেছিলাম যে, অন্তত ২৫ জনের মতো বাংলাদেশিকে পোলিশ সীমান্ত পুলিশ আটকে রেখেছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তাদের শেমিসেল শহরে সীমান্ত পুলিশকেন্দ্র থেকে একে একে ছাড়া হয়েছে। অন্তত ১৬ জন গতকাল ছাড়া পেয়েছেন। আজ আরও অনেকে ছাড়া পাবেন বলে জানতে পেরেছি।'

পোল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তা অনির্বাণ নিয়োগী তাদের ছাড়াতে কাজ করছেন বলে জানান তিনি। 

'এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, মেডিকা সীমান্ত দিয়ে অনেক শরণার্থী প্রবেশ করলেও, দূতাবাসের মাত্র একজন কর্মকর্তা সেখানে কাজ করছেন। এ ক্ষেত্রে লোকবল বাড়ালে বাংলাদেশি প্রবাসীদের ব্যবস্থাপনা আরও সহজ হতে পারত। আর অনেক বাংলাদেশি এখনো দূতাবাসের সহায়তার বিষয়টি জানেন না, বা অনেকে সীমান্ত পার হওয়ার পর নিজেদের মতো করেই অন্যত্র চলে যান। এ রকম কয়েকজনের সঙ্গেও কথা হয়েছে আমার,' বলছিলেন এই সাংবাদিক। 

1fa92d65-d057-42ab-9a3c-7512227b9b47.jpg
ছবি: ডয়েচে ভেলের সৌজন্যে

মেডিকা সীমান্ত থেকে বাংলাদেশি ছাড়াও ভারতীয়, পাকিস্তানি এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের পোল্যান্ডে প্রবেশ করতে দেখেছেন তিনি। সেখানে বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে কাজ করতে দেখা যায়।

সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে শরণার্থীদের জন্য গরম পোশাকের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি গরম খাবার, চিকিৎসা এবং রাতে ঘুমানোর ব্যবস্থাও করা হয়। 

আরাফাত জানান, ইউক্রেনীয়রা ছাড়া বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের সীমান্ত এলাকায় থাকতে তেমন একটা আগ্রহ দেখা যায়নি। বরং সীমান্ত পার হওয়ার পরপরই তাদের ওয়ারশসহ বিভিন্ন শহরে চলে যাওয়ার চেষ্টা করতে দেখা যায়।

এখনো অনেক বাংলাদেশি ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে আটকে আছেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন। তাদের উদ্ধারে বাংলাদেশ সরকারকে জরুরি উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ডয়েচে ভেলের সাংবাদিক আরাফাতুল ইসলাম।