যে কারণে ইউক্রেনকে ‘নো-ফ্লাই জোন’ ঘোষণার সম্ভাবনা নেই
ইউক্রেনের আবাসিক এলাকায় রাশিয়ার বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে প্রতিদিন বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও দেশটির আকাশে নো-ফ্লাই জোন ঘোষণার পরিকল্পনা নেই পশ্চিমাদের।
গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকে এক ইউক্রেনীয় নারী ডারিয়া কালেনিউক অনুরোধ করে বলেন, 'ইউক্রেনের জনগণ মরিয়া হয়ে পশ্চিমের কাছে আমাদের আকাশসীমায় নিরাপত্তার জন্য অনুরোধ করছে। আমরা চাইছি ইউক্রেনের আকাশসীমাকে নো-ফ্লাই জোন ঘোষণা করা হোক। বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের কারণে ইউক্রেনের সব নাগরিক, এমনকি শিশুরাও গভীর আতঙ্কে রয়েছে।'
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেনের আকাশসীমাকে নো-ফ্লাই জোন ঘোষণা করা হলে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার সরাসরি যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হবে।
নো-ফ্লাই জোন কী?
আকাশসীমার কোনো অঞ্চলকে 'নো-ফ্লাই জোন' ঘোষণার অর্থ হলো সেখানে কোনো উড়োজাহাজ উড়তে পারবে না। সংবেদনশীল এলাকা যেমন- রাজপ্রাসাদ রক্ষা করতে কিংবা কোনো খেলার আয়োজনে অথবা বড় সমাবেশের ক্ষেত্রেও স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে নো-ফ্লাই জোন ঘোষণা করা হয়ে থাকে।
সাধারণত সামরিক বাহিনী কোনো সম্ভাব্য আক্রমণ বা নজরদারি এড়াতে নো-ফ্লাই জোন ঘোষণা ও এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে থাকে। সেক্ষেত্রে কেউ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নো ফ্লাই জোনে প্রবেশ করলে সামরিক বাহিনী ওই উড়োজাহাজকে নামিয়ে ফেলতে পারে।
ইউক্রেনকে 'নো-ফ্লাই জোন' কেন করবে না পশ্চিমা বিশ্ব
ইউক্রেনকে নো-ফ্লাই জোন ঘোষণার অর্থ হলো রাশিয়ার কোনো উড়োজাহাজকে গুলি করে নামাতে হবে। যাতে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে পশ্চিমারা।
রাশিয়ান বিমান বা সরঞ্জামের বিরুদ্ধে আক্রমণের অর্থই হলো বড় ধরনের যুদ্ধের শুরু।
মার্কিন বিমান বাহিনীর সাবেক জেনারেল ফিলিপ ব্রেডলভ ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ন্যাটোর সর্বোচ্চ মিত্রবাহিনীর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনকে তিনি বলেন, 'আপনি যখন ঘোষণা দেবেন যে "এটি একটি নো-ফ্লাই জোন", তখন আপনাকে একটি নো-ফ্লাই জোনের জন্য যা যা কিছু প্রয়োজন হয় সবকিছুই প্রয়োগ করতে হবে।'
'নো-ফ্লাই জোন ঘোষণার জন্য ইউক্রেন পশ্চিমা বিশ্বের কাছে যে আহ্বান জানাচ্ছে তাতে আমি সমর্থন জানাই। তবে এটি অত্যন্ত গুরুতর সিদ্ধান্ত,' বলেন তিনি।
তিনি বলেন, 'এটি যুদ্ধের সমতুল্য। যদি আমরা একটি নো-ফ্লাই জোন ঘোষণা করি, তাহলে আমাদের শত্রুদের গুলি চালানোর প্রস্তুতি নিয়ে নামাতে হবে এবং আমাদের নো-ফ্লাই জোনকে বাস্তবায়ন করতে হবে।'
ব্রিটিশ এমপি টোবিয়াস এলউডসহ অনেকেই আংশিক বা সম্পূর্ণ নো-ফ্লাই জোনের ধারণাকে সমর্থন করেছেন। তিনি ইউক্রেনে বেসামরিক মৃত্যু ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের কথা তুলে ধরে এ ব্যাপারে ন্যাটোকে হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল জেনস স্টলটেনবার্গ সোমবার এনবিসিকে বলেন, 'আমাদের স্থল বা আকাশপথ- কোনোভাবেই ইউক্রেনে যাওয়ার ইচ্ছে নেই।'
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা সচিব বেন ওয়ালেস বলেছেন, 'ব্রিটেন ইউক্রেনের উপর নো-ফ্লাই জোন কার্যকর করতে সাহায্য করবে না কারণ তাতে ইউরোপে যুদ্ধ শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে।'
বিবিসি রেডিও ফোর-এর আজকের অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, 'আমি কোনো ইউরোপীয় যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটাবো না, তবে আমি যা করব তা হলো ইউক্রেনকে প্রতিটি রাস্তায় যুদ্ধ করতে সাহায্য করবো। আমরা তাদের কাছে পৌঁছাতে পারি এমন প্রতিটি সরঞ্জাম দিয়ে, এবং আমরা তাদের সমর্থন করবো।'
যুক্তরাষ্ট্রও একই কারণে এই সম্ভাবনা বাতিল করেছে।
রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাতের অন্যতম ঝুঁকি হলো রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র। গত রোববার রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র বহনকারী বাহিনীকে উচ্চ সতর্কতায় থাকার নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এরপর থেকেই বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এর আগে কি নো-ফ্লাই জোন ব্যবহার করা হয়েছে?
১৯৯১ সালে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও জোটের অংশীদাররা কিছু জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য ইরাকে দুটি নো-ফ্লাই জোন ঘোষণা করেছিল। জাতিসংঘের সমর্থন ছাড়াই এটি করা হয়েছিল।
১৯৯২ সালে বলকান যুদ্ধের সময় জাতিসংঘ একটি প্রস্তাব পাস করে, যা বসনিয়ার আকাশসীমায় অনুমোদন ছাড়া সব ধরনের সামরিক ফ্লাইট নিষিদ্ধ করেছিল। লিবিয়ায় ২০১১ সালের সামরিক হস্তক্ষেপের অংশ হিসেবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদও একটি নো-ফ্লাই জোন অনুমোদন করে। বসনিয়ান ও লিবিয়ার অঞ্চলগুলোতে ন্যাটো বাহিনী এটি জারি করেছিল।
