ইউক্রেনে ‘ক্ষ্যাপাটে যুদ্ধ’র সমালোচনায় রুশ ধনকুবের ওলেগ তিনকভ
ইউক্রেনে চলমান রুশ আগ্রাসনের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়া রাশিয়ার কোটিপতি ব্যবসায়ী ওলেগ তিনকভ (৫৪) এই 'ক্ষ্যাপাটে যুদ্ধ' বন্ধে উদ্যোগী হওয়ার জন্য পশ্চিমা নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
পাশাপাশি এই যুদ্ধের ভেতর দিয়ে ইউক্রেনে রাশিয়া যে 'হত্যাযজ্ঞ' চালাচ্ছে, তার তীব্র সমালোচনাও করেছেন এই ধনকুবের।
গতকাল বুধবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়।
ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা শুরুর পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রসহ মিত্র দেশগুলো মস্কোর বিরুদ্ধে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে। আর রাশিয়ার বিরুদ্ধে নেওয়া সবচেয়ে কঠোর পদক্ষেপগুলোর একটি হচ্ছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। সুনির্দিষ্টভাবে রাশিয়ার কয়েকজন কোটিপতির বিরুদ্ধেও এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ফলে ওই ব্যবসায়ীদের আর্থিক কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতাও বহুলাংশে সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
আল জাজিরায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ওলেগ তিনকভ গতকাল বুধবার দাবি করেন, প্রায় ৯০ শতাংশ রুশ নাগরিক ভ্লাদিমির পুতিনের ইউক্রেনে হামলার সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নন। তিনি একইসঙ্গে রুশ সামরিক বাহিনীকে 'বর্জ্য পদার্থ'র সঙ্গে তুলনা করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চলমান যুদ্ধ নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো রুশ কোটিপতির কাছ থেকে আসা সবচেয়ে কড়া সমালোচনা এটিই।
রাশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রেডিট কার্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান 'তিনকফ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ওলেগ তিনকভ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বাইরেই থাকছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে তিনকভ বলেন, 'আমি এই ক্ষ্যাপাটে যুদ্ধের কোনো সুবিধাভোগী দেখছি না। নিরীহ মানুষ ও সেনারা মারা যাচ্ছেন।'
একইসঙ্গে তিনি পুতিনকে সম্মানজনকভাবে সেনা প্রত্যাহারের সুযোগ করে দিতে পশ্চিমের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান।
চলমান ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন কমপক্ষে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ।
পুতিনের দাবি ইউক্রেনকে 'নিরস্ত্রীকরণ ও উগ্র জাতীয়তাবাদীদের হাত থেকে রক্ষা করা' এই বিশেষ সামরিক অভিযানের উদ্দেশ্য।
ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা শুরুর পর তিনকভসহ বেশ কয়েকজন রুশ নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, যাতে পুতিন যুদ্ধ থেকে পিছু হটতে বাধ্য হন। এর পরিপ্রেক্ষিতে একাধিক রুশ কোটিপতি জনসম্মুখে শান্তির আহ্বান জানিয়েছেন। আবার অনেকে আবার ক্রেমলিনের পক্ষ নিয়েছেন। তারা রুশ সামরিক বাহিনীর সমর্থনে ইংরেজি অক্ষর 'জেড' লোগো সম্বলিত প্রচারণায় অংশ নেন।
এ প্রসঙ্গে তিনকভ বলেন, 'অবশ্যই কিছু বোকা মানুষ আছেন, যারা জেড আঁকছেন। কিন্তু, সব দেশেরই ১০ শতাংশ মানুষ বোকা হয়। বাকি ৯০ শতাংশ রুশ এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।'
তিনি পুতিন বা ক্রেমলিনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, 'কর্মকর্তারা দেখতে পাচ্ছেন তাদের ছেলেমেয়েরা আগামী গ্রীষ্মে ছুটি কাটাতে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোয় যেতে পারছে না। আবার ব্যবসায়ীরাও হন্যে হয়ে তাদের বাকি সম্পত্তি সুরক্ষিত করার চেষ্টা করছেন।'
ধনকুবের তিনকভ এমন একটি সময়ে এই পোস্টটি দিয়েছেন যখন রুশ বাহিনী ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ থেকে সরে এসে সে দেশের পূর্ব দিকের দনবাস অঞ্চলে নতুন করে হামলা শুরু করেছে।
পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর দাবি, রুশ বাহিনী ইউক্রেনের প্রতিরোধের মুখে টিকতে না পেরে সেখান থেকে তাদের লক্ষ্য সরিয়ে নিয়েছে।
তিনকভের ভাষ্য, 'মদ্যপ' অবস্থায় ঘুমানোর পর জেগে উঠে রুশ জেনারেলরা বুঝতে পেরেছেন যে, তাদের সেনাবাহিনীর গুণগত মান 'বর্জ্য পদার্থ'র মতো।
ইনস্টাগ্রামে দেওয়া পোস্টের একটি অংশ রুশ ভাষায় লিখলেও তিনকভ ইংরেজিতে লিখেছেন, 'প্রিয় পশ্চিম, দয়া করে মিস্টার পুতিনকে সম্মানজনকভাবে সেনা সরিয়ে নেওয়ার পথ করে দিন, যাতে তিনি মুখরক্ষা করতে পারেন এবং এই হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করুন। দয়া করে আরও বাস্তববাদী ও মানবতামূলক মনোভাব বজায় রাখুন।'
তিনকভ সাইপ্রাসভিত্তিক টিসিএস গ্রুপ হোল্ডিংয়ের ৩৫ শতাংশের মালিক। এর আওতায় ব্যাংকিং, বীমা ও মোবাইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ বছর প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম খুব দ্রুত কমে গেছে।
২০২০ সালে তিনকফ ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদ ছেড়ে দেন।
এক বার্তায় ব্যাংকটি জানিয়েছে, তিনকভের 'ব্যক্তিগত মতামত' নিয়ে তারা কোনো মন্তব্য করবে না। এতে আরও বলা হয়েছে, তিনি এখন আর তিনকফ ব্র্যান্ডের আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর দৈনন্দিন কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত নন।