‘বিশ্ব আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে না’ 

স্টার অনলাইন ডেস্ক

'ভগ্ন হৃদয় আর গভীর আশা নিয়ে লিখছি আপনারা এই সুন্দর দেশকে তালেবানের হাত থেকে রক্ষায় আমাদের সঙ্গে যোগ দিন।' কাবুল তালেবানদের দখলে যাওয়ার দুদিন আগে আফগান চলচ্চিত্র নির্মাতা সাহরা কারিমি সারা বিশ্বের চলচ্চিত্র কমিউনিটিকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, বিশ্ব আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে না।
এটি মানবিক সংকট, আর বিশ্ব নীরব তাকিয়ে আছে, বলেন কারিমি।
এরই মধ্যে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল দখলে নিয়েছে তালেবান। দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি। তালেবান ক্ষমতা থেকে বাঁচতে দেশ ছাড়তে মরিয়া সাধারণ মানুষও।
কাবুল পতনের দুই দিন আগে নিজের দেশ, দেশের মানুষ বিশেষ করে দেশটির চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানান চলচ্চিত্র নির্মাতা ও আফগান ফিল্ম এর বর্তমান মহাপরিচালক সাহরা কারিমি। যিনি এই পদে দেশটির প্রথম নারী চলচ্চিত্র নির্মাতাও।
তালেবানদের নির্মম অত্যাচার নিয়ে কারিমি লেখেন, 'গত কয়েক সপ্তাহে তালেবান অনেকগুলো প্রদেশ দখলে নিয়েছে। তারা আমাদের মানুষকে হত্যা করেছে, অনেক শিশুকে অপহরণ করেছে, কন্যা শিশুদের তাদের লোকদের কাছে বিয়ের কনে হিসেবে বিক্রি করেছে, পোশাকের অজুহাতে হত্যা করেছে নারীকে, চোখ তুলে ফেলেছে এক নারীর, নির্মম নির্যাতন করে মেরে ফেলেছে আমাদের প্রিয় একজন কমেডিয়ানকে, হত্যা করেছে কবিকে, আমাদের কালচার অ্যান্ড মিডিয়া প্রধানকে হত্যা করেছে।'
টুইটারে দেওয়া ওই চিঠিতে কারিমি আরও বলেন, সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠদের হত্যা করেছে তালেবানরা, কাউকে জনসম্মুখে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে। লক্ষ লক্ষ পরিবারকে করেছে ঘরহারা। নিজেদের প্রদেশ ছেড়ে পালিয়ে কাবুলে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে অনেকে, যেখানে তারা ভয়ংকর অবস্থার মধ্যে আছে। ক্যাম্পগুলোতে নিরাপত্তার অভাব। দুধের অভাবে শিশুরা মারা যাচ্ছে। এটি মানবিক সংকট আর বিশ্ব নীরব তাকিয়ে আছে।
কারিমি বলেন, অন্যায় জেনেও এই নীরবতায় আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। আমরা জানি, আমাদের জনগণকে এভাবে ফেলে যাওয়ার এই সিদ্ধান্ত ঠিক নয়। আমরা যখন পশ্চিমাদের জন্য স্নায়ুযুদ্ধ জিতিয়ে দিলাম তখন এমন তাড়াহুড়ো করে এই সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। তালেবানদের অন্ধকার শাসন চাপিয়ে দিয়ে আমাদের জনগণকে ভুলে যাওয়া হলো। আমাদের যেভাবে পরিত্যাগ করা হলো তাতে দেশের ২০ বছরের অগ্রযাত্রা এবং বিশেষ করে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই অন্ধকারে হারিয়ে যেতে পারে।
'আপনারা সোচ্চার হন। গণমাধ্যম, সরকার এবং বিশ্বের মানবিক সংস্থাগুলো নীরব হয়ে আছে যেন এটি তালেবানের সঙ্গে এই শান্তি চুক্তি সবসময়ই বৈধ ছিল। এটি কখনোই বৈধ ছিল না। তাদের বৈধতা দেওয়ার অর্থ ক্ষমতায় আসতে তালেবানদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেওয়া। আলোচনার পুরো সময়টিতেই তালেবানরা আমাদের জনগণের উপর অত্যাচার চালিয়েছে, বলেন কারিমি।
তিনি বলেন, একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে এই দেশে আমি যে কঠোর পরিশ্রম করেছি তা শেষ হবার উপক্রম হয়েছে। যদি তালেবান ক্ষমতা নেয় তাহলে তারা সব ধরনের শিল্প নিষিদ্ধ করবে। আমি ও আমার মতো অন্য চলচ্চিত্র নির্মাতারা হয়তো তাদের হত্যার পরবর্তী তালিকায় থাকবো। তারা নারী অধিকার ক্ষুণ্ন করবে এবং আমাদের মতামতকে চুপ করিয়ে দেবে।
যখন তালেবান ক্ষমতায় ছিল কোনো মেয়ে স্কুলে যেতে পারেনি। এখন ৯০ লাখ মেয়ে স্কুলে যায়। আফগানিস্তানের তৃতীয় বৃহত্তম শহর হেরাত যা মাত্রই তালেবানের দখলে গেল সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৫০ ভাগ শিক্ষার্থী নারী। এই অগ্রগতির কথা বিশ্ব জানে না। গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তালেবান অনেক স্কুল ধ্বংস করে দিয়েছে এবং অন্তত ২০ লাখ ছাত্রী স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
কারিমি বলেন, এই বিশ্বকে আমি বুঝতে পারছি না। তাদের এই নীরবতা বুঝতে পারছি না। আমি এখানেই থাকবো এবং নিজের দেশের জন্য লড়াই করব, কিন্তু একা আমার পক্ষে তা সম্ভব নয়। আপনাদের মতো বন্ধু দরকার। আমাদের সাথে যা হচ্ছে তা বিশ্বকে জানাতে আমাদের সাহায্য করুন। আফগানিস্তানের বাইরে আমাদের কণ্ঠস্বর হন আপনারা। যদি কাবুলের দখল নেয় তালেবানরা তাহলে আমরা হয়তো আর ইন্টারনেট সংযোগ কিংবা যোগাযোগের অন্য কোনো মাধ্যম পাবো না। দয়া করে আপনাদের চলচ্চিত্র নির্মাতা, শিল্পীদের এর সঙ্গে যুক্ত করুন।
এই যুদ্ধ গৃহযুদ্ধ নয়, এটি প্রক্সি ওয়ার। এটি আরোপিত যুদ্ধ আর এটি আমেরিকা আর তালেবানের চুক্তির ফলাফল। আপনাদের গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ বিষয়টি তুলে ধরুন।
কারিমি বলেন, আপনাদের সাহায্য আমাদের দরকার। আফগান নারী, শিশু, শিল্পী এবং চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য আপনাদের সাহায্য দরকার।
বিশ্ব যেন আফগানিস্তানকে এভাবে ছেড়ে না যায় সে জন্য আমাদের সাহায্য করুন।
তার এই আকুল আবেদনে সাড়া দিয়ে বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এবং চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা আফগান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
এদিকে গতকাল রোববার টুইটারে এক ভিডিওতে কাবুলের রাস্তায় সারাহ কারিমিকে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে দৌড়াতে দেখা যায়। সেখানে তিনি বলেন, তালেবানরা শহরে ঢুকে পড়েছে এবং সবাই পালাচ্ছে। সবাই ভীত, আতঙ্কিত।