তালেবান নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা: চাকরি হারাচ্ছেন নারী কর্মীরা

স্টার অনলাইন ডেস্ক

জুলাইয়ের শুরুতে তালেবান বাহিনী যখন আফগানিস্তানের বিভিন্ন অংশের দখল নিচ্ছিল, তখন একদল যোদ্ধা দেশটির দক্ষিণের শহর কান্দাহারে অবস্থিত আজিজি ব্যাংক ভবনে ঢুকে সেখানে কর্মরত নয় জন নারী কর্মীকে বের হয়ে যেতে বলেন।

ব্যাংকটির ম্যানেজার ও তিন জন নারী কর্মীর বরাতে জানা গেছে, অস্ত্রধারী যোদ্ধারা তাদেরকে নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেয় এবং তাদেরকে অফিসে ফিরে যেতে নিষেধ করে। যোদ্ধারা তাদের জানান, তাদের পরিবারের পুরুষ সদস্যরা নারী কর্মীদের বদলে কাজে যোগ দিতে পারবেন।

ব্যাংকটির হিসাবরক্ষণ বিভাগের কর্মী নুর খাতারা (৪৩) বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, 'কাজে যাওয়ার অনুমতি না পাওয়ার ব্যাপারটি খুবই বিচিত্র, কিন্তু এখনকার বাস্তবতা এটাই।'

তিনি আরও বলেন, 'আমি ইংরেজি শিখেছি এবং কীভাবে কম্পিউটারে কাজ করতে হয়, সেটিও শিখেছি। কিন্তু এখন আমাকে এমন এক জায়গায় কাজ খুঁজে পেতে হবে যেখানে আমি নারীদের সঙ্গে কাজ করতে পারবো।'

২০ বছর আগে তালেবান সরকার উৎখাত হওয়ার পর আফগানিস্তানের নারীরা যেসব অধিকার অর্জন করেছেন, তার কিছুটা তারা আবারও হারিয়ে ফেলতে পারেন বলেই পূর্বাভাষ দিচ্ছে এই ঘটনাটি।

মার্কিন বাহিনী গত মে থেকে নিজেদের প্রত্যাহার প্রক্রিয়া শুরুর পরই তালেবান বাহিনী ধারাবাহিকভাবে দেশের বিভিন্ন অংশ দখল করে নিয়েছে। গতকাল রোববার তারা রাজধানী কাবুলে প্রবেশ করে এবং কার্যত দেশটির শাসন ক্ষমতা এখন তাদেরই হাতে।

তালেবানদের সর্বশেষ শাসনামলে (১৯৯৬-২০০১), নারীদের কাজ করার ও মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। কোনো কারণে নরীদের বাসা থেকে বের হতে হলে সঙ্গে একজন পুরুষ আত্মীয়কে নিয়ে যেতে হতো।

এই আইন না মানলে তাদেরকে জনসম্মুখে অপমান করা হতো। তালেবানদের ধর্মীয় পুলিশ শাস্তি হিসেবে তাদেরকে প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত করতেন।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তালেবান নেতারা রাজনৈতিক সমাধানের উদ্দেশ্যে আয়োজিত বিভিন্ন আলোচনায় পশ্চিমা নেতাদের আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, নারীরা ইসলাম ধর্মের নীতিমালা অনুযায়ী সমঅধিকার পাবেন। যার মধ্যে চাকরি ও পড়ালেখা করার ব্যাপারগুলো অন্তর্ভুক্ত আছে।

আজিজি ব্যাংকের ঘটনাটির দুদিন পরে একইরকম আরেকটি ঘটনা ঘটে দেশটি পশ্চিমের শহর হেরাতে অবস্থিত ব্যাংক মিল্লির একটি শাখায়। সেখানে কর্মরত দুজন নারী ক্যাশিয়ার ঘটনার বর্ণনা দেন।

তারা জানান, তিন জন বন্দুকধারী তালেবান যোদ্ধা ব্যাংকের শাখাটিতে প্রবেশ করেন এবং নারী কর্মীদের 'জনসম্মুখে চেহারা দেখানোর' জন্য বকাঝকা করেন। ফলে, শাখাটির সব নারী কর্মী চাকরি ছেড়ে দেন এবং তাদের জায়গায় পুরুষ আত্মীয়দের কাজে যোগ দিতে পাঠান।

এ দুটি ঘটনার বিষয়ে মন্তব্য জানতে রয়টার্সের পক্ষ থেকে তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। ব্যাংক দুটির পক্ষ থেকেও এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

তবে তালেবান নিয়ন্ত্রিত এলাকার ব্যাংকগুলোতে নারী কর্মীদের কাজ করতে দেওয়া হবে কী না, সামগ্রিক এই প্রশ্নের জবাবে মুজাহিদ জানান, এ ব্যাপারে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, 'দেশে ইসলামি ব্যবস্থার প্রচলনের পর আইন অনুযায়ী এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং ইনশাল্লাহ, কোনো সমস্যা হবে না।'

যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা শক্তিরা আশংকা করছেন, তালেবানরা নারীদের অর্জিত বিভিন্ন অধিকার খর্ব করবে।

মার্কিন সেনাবাহিনীর মদদে গত ২০ বছরের আফগান সরকারের শাসনামলের অন্যতম প্রধান সাফল্য হিসেবে নারীদের অর্জিত অধিকারের কথা উল্লেখ করা হয়। তবে অধিকারের বিষয়টি মূলত শহর কেন্দ্রিক।

গত বছর থেকে তালেবান ও আফগান সরকারের মধ্যে আলোচনা শুরু হওয়ার পর থেকে অসংখ্য নারী সম্মুখযোদ্ধা প্রাণ হারিয়েছেন। যাদের মধ্যে আছেন সাংবাদিক, স্বাস্থ্য কর্মী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা।

সরকার তালেবান বাহিনীর বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপূর্ণ হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এনেছে, কিন্তু তারা সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করার জন্য আততায়ী পাঠানোর অভিযোগ মেনে নেয়নি।

আফগান সরকারের এক মুখপাত্র জানিয়েছিলেন, 'তালেবানরা সকল ক্ষেত্রে স্বাধীনতা খর্ব করবে এবং এ কারণেই আমরা তাদের বিরুদ্ধে লড়ছি।'

তিনি আরও বলেছিলেন, 'নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছেন এবং আমাদের বাহিনী গণতন্ত্রকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। সারা বিশ্বের এই বিষয়টি বোঝা উচিৎ এবং আমাদেরকে সাহায্য করা উচিৎ।'

লাখো শিক্ষিত আফগান নারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাহায্যের আবেদন করেছেন এবং তাদের হতাশার কথা বলেছেন।

রাদা আকবর একটি টুইটার বার্তায় বলেন, 'একেকটি শহরের পতনের সঙ্গে পতন হচ্ছে দেহের, স্বপ্নের, পুরনো ইতিহাস ও ভবিষ্যতের, শিল্প ও ঐতিহ্যের, জীবন ও সৌন্দর্যের। আমাদের চারপাশের পুরো পৃথিবীর পতন হচ্ছে।'

তিনি মিনতি করেন, 'কেউ দয়া করে এটি থামান।'