রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীর সাজে শাহজাদপুর কাছারিবাড়ি, ৩ দিনব্যাপী উৎসব শুরু কাল
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর রবীন্দ্র কাছারিবাড়িতে কাল থেকে শুরু হতে যাওয়া তিন দিনব্যাপী উৎসবের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
তবে ঐতিহাসিক এই স্থাপনায় প্রথমবারের মতো বড় ধরনের সংস্কার কাজ চলায় এবারের উৎসবে দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ থাকছে রবীন্দ্র জাদুঘর।
শাহজাদপুর রবীন্দ্র কাছারিবাড়ি কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত স্থাপত্য, এখান থেকে তিনি তার জমিদারি পরিচালনা করতেন। সে সময়ের প্রথাগত জমিদারদের চেয়ে আলাদা রবীন্দ্রনাথ এখানে এসে সাধারণ মানুষের খুব কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।
কবির জন্মের অনেক আগে ১৮৪০ সালে নাটোরের জমিদার রানি ভবানীর কাছ থেকে শাহজাদপুর এস্টেট কিনেছিলেন তার দাদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর। পরবর্তীতে এই জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব পেয়ে রবীন্দ্রনাথ বেশ কয়েকবার শাহজাদপুর সফর করেন। ১৯০১ সালে তার শেষ সফরে এখানে তিনি অসংখ্য অমূল্য স্মৃতি রেখে গেছেন।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এখানে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করলেও ঐতিহাসিক কাছারিঘরটি (যেখানে প্রজারা খাজনা দিতে ও কবির সঙ্গে দেখা করতে আসতেন) বহু বছর আগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিত্যক্ত সেই স্থাপনাটিই এখন ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখে মূল আদলে ফিরিয়ে আনতে সংস্কার করা হচ্ছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় প্রকৌশলী বিদ্যুৎ দাস জানান, জমিদারি আমলের এই বিশাল একতলা ভবনটি চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত। ভবনের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় ছিল।
তিনি আরও জানান, প্রায় ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে গত জানুয়ারি থেকে এই সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে, ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা। ইতোমধ্যে কাজের ৮০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় কাছারিঘরের ভিত্তি ও দেয়াল পুনর্গঠনের পাশাপাশি কবির মূল বাসভবন (বর্তমান রবীন্দ্র জাদুঘর) মেরামত করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ দাস বলেন, প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী অনুসরণ করে চুন-সুরকি দিয়ে দেয়াল গাঁথুনি এবং চুন-বালুর প্লাস্টার করা হচ্ছে। দক্ষ প্রত্নতাত্ত্বিক কর্মীরা ভবনটিকে পুরোনো রূপ দেওয়ার কাজ করছেন। তবে বর্তমান বরাদ্দে ছাদ সংস্কার করা সম্ভব না হলেও আগামী বাজেটে বরাদ্দ পেলে তা শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শাহজাদপুর রবীন্দ্র কাছারিবাড়ির কাস্টোডিয়ান শাওলী তালুকদার জানান, সংস্কার কাজের নিরাপত্তার স্বার্থেই আপাতত জাদুঘরটি বন্ধ রাখা হয়েছে। এবারের উৎসবেও দর্শকরা ভেতরে ঢুকতে পারবেন না। তবে কাছারিবাড়ি চত্বরে তিন দিনব্যাপী রবীন্দ্র উৎসব হবে।
আগামীকাল শুক্রবার শুরু হয়ে রোববার পর্যন্ত চলা এই উৎসবে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাচ, কবিতা আবৃত্তি ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পীদের পরিবেশনায় রবীন্দ্রসংগীতো আয়োজন থাকছে।
রবীন্দ্র গবেষকদের মতে, এই অঞ্চলের দরিদ্র কৃষকদের প্রতি কবির মমত্ববোধের কারণে শাহজাদপুর কাছারিবাড়ির গুরুত্ব অপরিসীম।
রবীন্দ্র লেখক হাবিবুর রহমান স্বপন বলেন, তিনি শুধু জমিদার ছিলেন না, কৃষকদের অভাব-অভিযোগের পরম সুহৃদ ছিলেন। গবাদি পশুর চারণভূমির অভাবে কৃষকদের অনুরোধে তিনি পোরজনায় গো-চারণের জন্য বিশাল ঘাসের মাঠের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল আলীম বলেন, রবীন্দ্র সাহিত্যে শাহজাদপুরের প্রভাব অনস্বীকার্য। কবির বিখ্যাত গল্প 'পোস্টমাস্টার'-এর রতন বা 'দুই বিঘা জমি' কবিতার উপেন চরিত্রগুলো তিনি এখানকার সাধারণ মানুষকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই সৃষ্টি করেছিলেন।
উনিশ শতকের শুরুর দিকে ভাইঝি ইন্দিরা দেবীকে লেখা এক চিঠিতে কবি নিজেই লিখেছিলেন, ‘এখানে (শাহজাদপুর) আমি লেখার জন্য যতটা অনুপ্রেরণা পাই, তা অন্য কোথাও পাই না।’
শাহজাদপুরেই তিনি তার বিখ্যাত নাটক ‘বিসর্জন’-এর অংশবিশেষসহ ‘সোনার তরী’, ‘চিত্রা’, ‘চৈতালি’সহ অনেক কালজয়ী সাহিত্যকর্ম রচনা করেছিলেন। গবেষকদের মতে, এখান থেকে তিনি ৩৮টি চিঠি লিখেছেন।
বর্তমানে এই জাদুঘরে কবির ব্যবহৃত প্রায় ৩০০টি অমূল্য নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। এর মধ্যে কবির ব্যবহৃত টেবিল, চেয়ার, খাট ও পালকি রয়েছে।