দেশে আজ থেকে আবারও কাঙ্ক্ষিত সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হলো: প্রধানমন্ত্রী
দেশে আজ থেকে আবারও কাঙ্ক্ষিত সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হলো বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বক্তব্য রাখার সময় তিনি এ মন্তব্য করেন।
এর আগে তিনি একাত্তর থেকে চব্বিশ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নিহত, আহত ও নির্যাতিত সব মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের নির্মমতার শিকার অসংখ্য মানুষের কান্না আর হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অবশেষে আজ থেকে পুনরায় যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে জনগণের ভোটে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সত্যিকার অর্থে জনপ্রতিনিধিত্বশীল জাতীয় সংসদ।’
আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সংসদের ঐতিহাসিক মুহূর্তে আমি আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানাই, যার অশেষ রহমতে আমরা ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করতে পেরেছি। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধসহ এ পর্যন্ত দেশে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা শহীদ হয়েছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ শুরুর এই যাত্রালগ্নে আমি তাদেরকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি।’
‘এই আন্দোলন সংগ্রামে যেসব মায়েরা তাদের সন্তান হারিয়েছেন, যেসব সন্তানেরা তাদের প্রিয়জন হারিয়েছেন, যেসব পরিবার তাদের সন্তান-স্বজন হারিয়েছেন, যেসব আহত মানুষকে তাদের স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন হারাতে হয়েছে, যেসব মানুষগুলো নির্যাতন-নিপীড়ন, রাজনৈতিক হয়রানি কিংবা মিথ্যা মামলার শিকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন, আমি তাদের সকলের অবদানকেও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি।’
সর্বস্তরের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ, গুম-খুন, হত্যা, নির্যাতন-নিপীড়ন, মিথ্যা হামলা-মামলা কিংবা জীবন্ত মানুষের কবরস্থানতুল্য বর্বর বন্দিশালা—আয়নাঘর; কোনো কিছু দিয়েই যাদের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে রুখে দেওয়া যায়নি, যাদের সাহসী ভূমিকায় দেশে পুনরায় গণতন্ত্র ফিরে এসেছে, আমি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই যাত্রালগ্নে দেশের স্বাধীনতাপ্রিয়-গণতন্ত্রকামী বীর ছাত্রজনতাকে জানাই অভিনন্দন, যোগ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন। সেই গণতন্ত্রকে প্রহসনের রূপ দিয়ে জাতীয় সংসদকে হাস্যরসের খোরাকে পরিণত করা হয়েছিল। দেশের তাবেদারি শাসন-শোষণ কায়েম করা হয়েছিল। দেশের সংসদীয় গণতন্ত্র এবং জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করেছেন। জীবনে কখনোই স্বৈরাচার কিংবা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে আপস করেননি।’
‘দেশে আজ থেকে আবারও সেই কাঙ্ক্ষিত সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হলো, আলহামদুলিল্লাহ। সংসদীয় রাজনীতির প্রতিষ্ঠাতা খালেদা জিয়া দেশ এবং জনগণের সাফল্যে এই শুভ মুহূর্তটি দেখে যেতে পারেননি। আজ তাই এই জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আমরা দেশ এবং জনগণের স্বার্থে আপসহীন নেতৃত্ব, ব্যক্তিত্ব, স্মরণীয়-বরণীয়-অনুকরণীয় রাজনীতিবিদ মরহুমা খালেদা জিয়াকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা এবং পুনঃপ্রবর্তক স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের একটি উক্তির কথা আপনাদের সামনে আমি স্মরণ করতে চাই। তিনি বলেছিলেন, “জনগণই যদি রাজনৈতিক দল হয়, তাহলে আমি সেই দলেরই আছি”। অর্থাৎ ব্যক্তি কিংবা দলের স্বার্থ নয়, জনগণের স্বার্থই সবচাইতে বড়। এটাই বিএনপির রাজনীতি।’
‘আমি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। জাতীয় সংসদের সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হয়েছি। জাতীয় সংসদে দলের প্রতিনিধিত্ব করলেও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি এই জাতীয় সংসদে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছি। দল-মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে দেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছি। আমার রাজনীতি দেশ এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষা করার রাজনীতি,’ যোগ করেন তিনি।
‘বিএনপির রাজনীতি জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার রাজনীতি। প্রতিটি পরিবারকে স্বনির্ভর করাই আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য। প্রতিটি পরিবারকে স্বনির্ভর করার মাধ্যমেই বিএনপি একটি স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ, নিরাপদ, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই লক্ষ্য অর্জনে আমি গণতন্ত্রকামী মানুষের সমর্থন এবং সহযোগিতা চাইছি। এই মহান জাতীয় সংসদে সকল দলের নির্বাচিত প্রতিজন সংসদ সদস্যের সমর্থন এবং সহযোগিতা আশা করছি,’ যোগ করেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, আমাদের দল কিংবা মত কিংবা কর্মসূচি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তাবেদারমুক্ত, ফ্যাসিবাদমুক্ত, একটি স্বাধীন-সার্বভৌম, নিরাপদ, স্বনির্ভর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় আমাদের মধ্যে কোনো বিরোধ থাকতে পারে না, বিরোধ নেই। জাতীয় সংসদকে জাতীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু না করে বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট সরকার জাতীয় সংসদকে অকার্যকর করে ফেলেছিল। আমরা এই মহান জাতীয় সংসদকে সকল যুক্তিতর্ক আর জাতীয় সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চাই।’
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতির উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নতুন সংসদ যাত্রা শুরু করার সময় সংসদের সাবেক স্পিকার কিংবা ডেপুটি স্পিকার উপস্থিত থাকার কথা ছিল, কিন্তু পতিত পরাজিত বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট সরকারের জনবিরোধী এবং গণবিরোধী কর্মকাণ্ডের ফলে যে জনরোষ তৈরি হয়েছে বা জনরোষ তৈরি হয়েছিল, তাতে এই মহান সংসদের সাবেক স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাদের কেউ কারাগারে, কেউ নিখোঁজ কিংবা কেউ পলাতক।’
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী এবং তাবেদারি শাসন-শোষণের পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে আজ আমাদের এক বিশেষ পরিস্থিতিতে জাতীয় সংসদের কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আমরা সংবিধান এবং সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির বিধান অনুসরণ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সভাপতিত্ব করার জন্য আজ আমি প্রবীণ রাজনীতিবিদ এবং পাঁচবারের মতো নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য ডক্টর খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাব করছি।’
‘আমাদের সংসদীয় রীতিনীতির ইতিহাসে এই ধরনের পরিপ্রেক্ষিত নজিরবিহীন নয়। ১৯৭৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান ওই সংসদের সদস্য মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগিশের নাম প্রস্তাব করেছিলেন এবং তার সভাপতিত্বে বাংলাদেশের প্রথম সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছিল।’
এ সময় তিনি জাতীয় সংসদের সদস্যদের স্বাগত ও ধন্যবাদ জানান।