সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তি সিরিয়াস কনটেম্পট: শিশির মনির

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করে ১৫ জন কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে ন্যস্ত করে সরকার গুরুতর আদালত অবমাননা করেছে বলে মন্তব্য করেছেন শিশির মনির।

তিনি বলেন, ‘এই সচিবালয়ের স্ট্রাকচারকে তারা ডিসমেন্টাল করেছেন।’

আজ বুধবার দুপুরে আদালত চত্বরে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের ৩০ নভেম্বর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে। এরপর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ গত ১০ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের উদ্বোধন করেন।

পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১৫ জন বিচারকসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এদিকে গত ২ এপ্রিল বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনা করে মোট ২০টি অধ্যাদেশ সংসদে বিল আকারে পেশ না করার সিদ্ধান্ত নেয়। কার্যকারিতা হারানো এই অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশও ছিল।
পরে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারকদেরকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করে সরকার।

শিশির মনির বলেন, তারা (রাষ্ট্রপক্ষ) প্রথমে বলেছিলেন, আপিল ফাইল করবেন। আজকে হাইকোর্ট বিভাগ আমাদের বলেছেন, তারা সাত ৭ জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। ৭ জুনের পরে এই (নতুন আইনকে চ্যালেঞ্জ করে) রিট পিটিশন শুনানির জন্য হাইকোর্টে আসবে। কারণ ৭ এপ্রিলে রায় প্রকাশ হয়েছে। আপিল দায়ের করার সময়সীমা হলো ৬০ দিন। এই ৬০ দিন ৭ জুনে অতিক্রান্ত হবে।

তিনি জানান, রাষ্ট্রপক্ষকে আদালত বলেছিলেন, এটি তাদের ডিজায়ার, এই সময়ের ভেতরে সচিবালয়কে কোনোভাবেই যেন ডেস্ট্রয় করা না হয়, কিন্তু আদালতে সে ডিজায়ার তারা শোনেননি। আপিলও ফাইল করেননি। এই ধরনের আচরণ সিরিয়াসলি কনটেম্পটচুয়াস। আমরা কনটেম্পট নোটিশও দিয়েছি। আমরা দ্রুতই কনটেম্পট পিটিশনও ফাইল করব।

‘আমরা মনে করি, বিচার বিভাগের সঙ্গে এই ধরনের আচরণ করাটা শুধু দেশের জন্য ক্ষতি না, দেশের ভাবমূর্তি বিদেশেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটা বড় ধরনের সংস্কারের অংশ হিসেবে বিচার বিভাগের আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং এই সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সম্পর্কে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানুষের ভালো ধ্যান-ধারণা জন্ম নিয়েছিল। উচ্চ ধারণার জন্ম নিয়েছিল যে, বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থেই একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু যে কাজ এখন করছেন, এটা অনেকটা পেছন দিকে ছেড়ে দিচ্ছেন সব কিছু।’

সরকার সংস্কারের পক্ষে না মন্তব্য করে শিশির মনির বলেন, ‘তারা বিচারকদেরকে স্বাধীনতা দেওয়ার পক্ষে নয়। বিচারকদের নাকে তারা নাগপাশ লাগিয়ে রাখতে চান।’

এতে বিদেশেও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। বিদেশি অংশীজনরা এ সমস্ত ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আলোচনা করছেন, গোলটেবিল বৈঠক হচ্ছে।’

‘সরকার গতকালকে রাতে যা করেছেন, এটি সিরিয়াস কনটেম্পট করেছেন। আদালত অবমাননা করেছেন,’ বলেন তিনি।

শিশির মনির আরও বলেন, ‘এখনো হাইকোর্ট ডিভিশনের ডিরেকশনটা বহাল আছে। দ্বিতীয় বিষয় হলো, যে রিট পিটিশনটি পেন্ডিং আছে, ৭ জুনের পরে এটি শুনানির জন্য আসবে। তৃতীয়ত, হাইকোর্ট বিভাগ অ্যাটর্নি জেনারেলকে যে পায়াস উইশের কথা বলেছিলেন, সেই উইশের প্রতি তারা বিন্দু পরিমাণ শ্রদ্ধা দেখান নাই। চতুর্থত, এই কাজ করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি দেশ ও দেশের বাইরে ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে।’

এই ঘটনায় আদালত বিস্মিত হয়েছেন বলেও জানান রিটেরপক্ষের এই আইনজীবী।

সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় বহাল রাখার নির্দেশনা চেয়ে গত এপ্রিলে সাত আইনজীবী জনস্বার্থে রিট আবেদন করেন।

রিটকারীদের মধ্যে রয়েছেন আইনজীবী মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মিজানুল হক, আবদুল্লাহ সাদিক, মোহাম্মদ আবদুল ওয়াদুদ ও জায়াদ বিন আমজাদ এবং নিম্ন আদালতের আইনজীবী সাব্বির রহমান ও মাহমুদুল হাসান।

রিটে বিবাদী হিসেবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সংসদ সচিব, আইন সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

আবেদনে বলা হয়, সংবিধানের ৯৪(৪) ও ১১৬ এ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এর মৌলিক স্তম্ভগুলোর একটি, যা কোনোভাবেই ধ্বংস, ক্ষুণ্ন বা সীমিত করা যায় না। ক্ষমতার পৃথকীকরণের ধারণা সংবিধানে সুন্দরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রের তিন অঙ্গকে সংবিধান নির্ধারিত সীমার মধ্যে থেকে কাজ করতে হবে।

নির্বাহী ও আইনসভা কোনো আইন বা সংশোধনের মাধ্যমে বিচার বিভাগের ক্ষমতা ও কার্যাবলী কেড়ে নিতে পারে না। তাই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (বাতিল) আইন, ২০২৬ কে সংবিধানের পরিপন্থী ঘোষণা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

গত ৯ এপ্রিল সংসদ অন্তর্বর্তী সরকার জারি করা তিনটি অধ্যাদেশ বাতিল করে। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও একটি স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা সম্পর্কিত অধ্যাদেশও রয়েছে।