লেখক তৃতীয় শ্রেণির, কারণ তার লেখা একঘেয়ে
কিছু লেখক যেন সমাজের গায়ে ক্রমাগত হুল ফোটানো ডাঁশপোকা! কেউবা স্রেফ সেই কারণেই লেখেন, যে কারণে একজন কাঠমিস্ত্রি করেন কাঠের কাজ, আর সহকারী বাবুর্চি করেন রান্নার আগে রান্নার উপকরণ প্রস্তুত। এমনো বলা যায়, সমাজের গায়ে হুল ফোটানো লেখকরাও লেখেন, কারণ লেখাই তাদের কাজ। উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন, কিছু গল্প নিছকই স্বস্তি দেওয়ার জন্য লেখা হয় না। বরং এই গল্পগুলো পরস্পরবিরোধী বহুবিধ বয়ানের চল্টা খসিয়ে উন্মোচিত করে এক কাঁচা দগদগে ঘা, যা আমাদের সকলের। যেমনটা করে থাকেন শহীদুল জহির তার গল্পে। প্রথাগত অর্থে তিনি সহজপাচ্য নন।
শহীদুল জহিরের ধীরস্থির, নির্মোহ বর্ণনায় যুদ্ধের নৃশংসতা কিংবা স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনীতিতে কৌশলগত জোট অদলবদল প্রায়শই পাঠকের পাঁজরে যেন সজোরে আঘাত হানে। বিবমিষা জাগায়, আবার চোখও খুলে দেয়। এসব গল্পে পরিভ্রমণ করতে গিয়েই আমি এমন এক ইতিহাসের সাক্ষাৎ পাই, যার দেখা বিদ্যালয়ের পাঠে মেলেনি।
অনেকেই হয়তো তার গল্পের ভাঁজে ছড়িয়ে থাকা মাটিঘেঁষা রঙ্গশ্লেষ ও প্রায় অশালীন কৌতুকের স্পর্শে এসে আমার মতোই না চাইতেও মিটমিট করে হাসবেন। এদিকে জহিরের কল্পরাজ্যে, ভূতের গলির চান মিঞার বান্দরের দুধ খাওয়ার ঘটনা কিংবা একাত্তর সালে রাজাকার বদু মওলানার উদ্যোগে কাকদের মানুষের মাংস খাওয়ানোর দৃশ্য মোটেও আজগুবি ঠেকে না; বরং পুরান ঢাকা কিংবা সিরাজগঞ্জের প্রাত্যহিক জীবনপরিসরেও এসব কেচ্ছা দিব্যি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। বস্তুত বাস্তবতা আরও নির্মম, আরও বীভৎস!
বইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে, বাস্তবে ১৯৭১ সালে ঠাকুরগাঁওয়ের ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস ক্যাম্পে পাকিস্তানি সেনারা বন্দি মুক্তিযোদ্ধাদের বাঘের খাঁচায় ছুঁড়ে ফেলেছিল। এই মুক্তিযোদ্ধাদের পাকড়াও করা সম্ভব হয়েছিল মুখ্যত স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায়। আর এ তো কেবল একটি দৃষ্টান্তমাত্র! শহীদুল জহিরের কথাসাহিত্যের মূলে রয়েছে রাজনৈতিক বাস্তবতা, যা কখনো কখনো জনকথনের ভেতর দিয়ে প্রতিসরিত হয়ে ভিন্ন রূপে ধরা দেয়। এই লোকবয়ানই তার গল্পে বোনে স্বতন্ত্র বুনট। সেইসঙ্গে, গল্পবয়ানে অতিলৌকিক অনুষঙ্গের প্রবেশের দুয়ারও খুলে দেয়।
কোনো সাহিত্য যদি একাধারে আচ্ছন্ন ও আছর করে, যদি তা রসে-শ্লেষে ঋদ্ধ হয়েও হয় কোমল, তবে সেই সাহিত্যপাঠে পাঠকের প্রতিক্রিয়াও অনিবার্যভাবেই তীব্র ও গভীর হয়। তাই সম্প্রতি জহিরকে নিয়ে এক বিশিষ্ট বিদ্বজ্জনের মূল্যায়ন আমার চোখে পড়লেও আমি সঙ্গত কারণেই বিস্মিত হইনি।
অবশ্য বিশিষ্টজনের সেই মন্তব্য বিশেষত অনলাইন সাহিত্যসমাজকে যথেষ্ট ক্ষুব্ধ করেছে। ২৬ মিনিটের একটি বক্তৃতার অংশ হিসেবে ছড়িয়ে পড়া ৩৭ সেকেন্ডের এক ভাইরাল ভিডিও ক্লিপে আলোচ্য বিদ্বজ্জনকে বলতে শোনা যায়, ‘(শহীদুল জহিরকে) আমি প্রথম শ্রেণির দূরের কথা, তৃতীয় শ্রেণিরও মনে করি না। হি ইজ আ থার্ড-ক্লাস রাইটার।’
মন্তব্যটি আমাকে বিস্মিত করেনি। উল্টো আমি ভাবছি, একজন লেখক ‘তৃতীয় শ্রেণির’ কি না, তা নির্ণয়ের মাপকাঠি আসলে কী? তবে কি সাহিত্যকে ০ থেকে ১০০-এর কোনো স্কেলে ফেলে তুলনামূলক বিচার করা যায়? যদি যায়, তবে ১০০-এর ঘরে বসবেন কে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর না কালিদাস? আর সে সিদ্ধান্তই বা কিসের ভিত্তিতে নেওয়া হবে? কে কত বেশি লিখেছেন, তার ভিত্তিতে? কিন্তু এখানেও ঘাপলা আছে। লেখক তার সময়ের ফসল, আর যেকোনো সময়ের অর্থনৈতিক কাঠামোই সাহিত্যের বিষয় ও আঙ্গিককে রূপ দেয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, ০-এর ঘরে বসবেন কে? অনুসন্ধানের খোঁড়াখুঁড়ি চলতে থাকে এবং ভাইরাল হওয়া খণ্ডিত ক্লিপটিকে সামগ্রিকতায় দেখলে বোঝা যায়, আলোচ্য মন্তব্যটি জহির সম্পর্কে যতটুকু ধারণা দেয়, তারচেয়েও বেশি খোলাসা করে মন্তব্যকারীর অবস্থান। যদি লুই আলথুসারের সিম্পটোম্যাটিক পাঠপদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, অর্থাৎ মন্তব্যটির অন্তর্নিহিত ধ্বনিগুলোয় যদি আলো ফেলা হয়, তবে তা ক্ষমতার কাঠামোয় মন্তব্যকারীর অবস্থান ও আদর্শগত দৃষ্টিভঙ্গিকে দৃশ্যমান করে।
প্রাসঙ্গিক বক্তৃতাটি ২০২৪ সালের ১ মার্চে দেওয়া হলেও, এর খণ্ডিতাংশ ভাইরাল হয় চলতি বছরের জুনে। অর্থাৎ, ইউটিউবে পুরো ভিডিওটি প্রকাশিত হওয়ার প্রায় দুই বছর পর। বুয়েট সাহিত্য উৎসব আয়োজিত সেই আলোচনায় আমাদের বিশিষ্ট বিদ্বজ্জন প্রশ্ন তোলেন, কেন কিছু অঞ্চলের সাহিত্যকে ‘বিশ্বসাহিত্য’ বলা হয়, অথচ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে যে দেশগুলো স্বাধীন হয়েছে সেই দেশের সাহিত্যকে দেওয়া হয় ‘উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্য’-এর তকমা? বিশ্বজুড়ে ইংরেজি ভাষার হেজেমনি বা সম্মতিনির্ভর আধিপত্যের ওপর আরও জোর দিয়ে তিনি বলেন, ইংরেজিতে লেখা অথবা এ ভাষায় অনূদিত হওয়ার মানে হলো বিশ্ববাজারে চোখে পড়া এবং ‘বিশ্বসাহিত্য’র মহিমান্বিত দ্বারে কড়া নাড়ার সুযোগ খানিকটা হলেও তৈরি হওয়া। তবে বাংলাদেশ ঠিক বিশ্বমানের সাহিত্য এখনো তৈরি করতে সক্ষম হয়নি। এমনই মত দেন আলোচক।
এমনটি ধরে নেওয়ার ঝোঁক হতেই পারে যে, আলোচক হয়তো বিশ্ববাজারের নিন্দা করছেন, যেখানে ‘বিশ্বসাহিত্য’ হিসেবে গণ্য হওয়াটা ইংরেজিভাষী পাঠকের মানদণ্ডে বোধগম্য হওয়ার ওপর নির্ভর করে। অথবা তিনি হয়তো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারব্যবস্থার কথা পাড়ছেন, যে ব্যবস্থা কেবল গুটিকয় লেখককেই বৃহত্তর পরিসরে পরিচিত হয়ে ওঠার সুযোগ দেয়। বাকিরা উপেক্ষিত, স্বল্প-আলোচিত। বলি, আমরা কজনই-বা বিপম চাকমার নাম শুনেছি? আমার বিবেচনায়, তিনি ফ্রানৎস কাফকা বা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের চেয়ে কোনো অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ নন।
কিন্তু এসবের কোনোটিই আলোচ্য বিদ্বজ্জনের অনুসন্ধানের বিষয় নয়। তার জোরালো অভিমত, ইদানিং বাংলাদেশি সাহিত্য আন্তর্জাতিক পরিসরে অনূদিত হয়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলেও আদতে তা বিশ্বমানের পর্যায়ে পৌঁছোতে পারেনি। পরক্ষণে আলোচনার প্রসঙ্গ শহীদুল জহিরের দিকে মোড় নেয় এবং আমাদের বিজ্ঞ আলোচক তাকে ‘তৃতীয় শ্রেণির’ লেখক আখ্যা দেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসও নাকি ‘একঘেয়ে, ভয়ানক একঘেয়ে।’
ফের মনে প্রশ্ন জাগে, তবে কি ব্যক্তিগত রুচিই সাহিত্যমান বিচারের চূড়ান্ত মাপকাঠি? প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা চাই। দেখে আসা যাক, শহীদুল জহিরের গদ্যসাহিত্য কীভাবে বিশ্বসাহিত্যের জলছাপ বহন করে। পেশ করছি আমার ‘জওয়াব-এ-শিকওয়া’।
ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের মতে, যে সাহিত্যের বিষয়বস্তু ও আঙ্গিক বিশ্বায়নসৃষ্ট টানাপোড়েনে সাড়া দেয়, তা-ই বিশ্বসাহিত্য। অন্য কথায়, বিশ্বসাহিত্য হলো আধুনিক বিশ্বব্যবস্থার সাহিত্য। এখানে ‘আধুনিক’ বলতে বোঝানো হয়েছে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে। আর ‘বিশ্বব্যবস্থা’ বলতে বোঝানো হয়েছে আন্তঃসংযোগ আছে এমন একক কিন্তু অসম ব্যবস্থাকে।
আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, বিশ্বসাহিত্য হলো বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত সাহিত্য। এ ব্যবস্থায় একই ঐতিহাসিক মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদী আধুনিকতার বিকাশ ঘটলেও, তা ঘটে অসমভাবে। ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চল ভিন্ন ভিন্ন গতিতে ও অসমভাবে এই আধুনিকতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়।
গল্প-আখ্যানে এই সম্মিলিত অথচ অসম বিকাশ এমনভাবে চিত্রিত হতে পারে, যেখানে পুঁজিবাদী আধুনিকতার ভেতরে রয়ে যেতে পারে প্রাক-পুঁজিবাদী সামাজিক সম্পর্ক ও শ্রেণিকাঠামোর রেশ। যেমন: সামন্তীয় সামাজিক স্তরবিন্যাসের সঙ্গে সহাবস্থান করেই পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকাশ ঘটতে পারে। এই বৈপরীত্যটি জীবন্ত হয়ে উঠেছে শহীদুল জহিরের ‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’ উপন্যাসে (মওলা ব্রাদার্স, ১৯৯৫)।
নেপথ্যে সামরিক স্বৈরশাসক আইয়ুব খান প্রবর্তিত বেসিক ডেমোক্রেসি ব্যবস্থা, যা ছিল বিদেশি সহায়তানির্ভর, বিশেষত মার্কিন মদদপুষ্ট পুঁজিবাদী আধুনিকায়ন প্রকল্প। মূল দৃশ্যপটে আখ্যানের প্রধান চরিত্র ধনী কৃষক, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মফিজউদ্দিন নিজের পদটিকে চিরকালীন হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে। গ্রামীণ প্রভাবশালী লোকদের ক্ষমতায়ন করলেও প্রকৃত ক্ষমতা সামরিক ও আমলাতন্ত্রের হাতে কুক্ষিগত এই বেসিক ডেমোক্রেসির আস্কারায় আত্মবিশ্বাসী মফিজউদ্দিন তার কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে এমন কাউকে বরদাস্ত করতে নারাজ; বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে সে চেয়ারম্যান পদে টিকে থাকতে চায়।
সর্বোপরি, এই সমস্ত কিছুকে আচ্ছন্ন করে রাখে চাঁদের এক রহস্যময়, অলৌকিক উপস্থিতি; যেন তা পাহারা দেয়, হয়তো মফিজউদ্দিনের জীবনের গতিপথকেও নিয়ন্ত্রণ করে। সবমিলিয়ে, উপন্যাসটি বাস্তবতা ও অতিলৌকিকতার এক নকশিকাজ। উত্তর-আধুনিক আখ্যানরীতির বুননে বহুস্বরের বয়ান, যা আবার সরলরৈখিকও নয়। এতে রাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী বিকাশ চলমান থাকলেও সামন্তীয় সামাজিক সম্পর্কের রেশ টিকে থাকে। এই টুকরো টুকরো উপাদানগুলোকে এক সুতায় গাঁথলে তা সম্মিলিত অথচ অসম বিকাশকে মূর্ত করে তোলে।
এবারে বিকল্প যুক্তি। যুক্তিবিদ্যায় প্রচলিত সিলোজিজমের সবচেয়ে প্রাথমিক ও সরলতম যুক্তিকাঠামো—যেমন: ‘সকল মানুষ মরণশীল, সক্রেটিস মানুষ, অতএব সক্রেটিস মরণশীল’—প্রয়োগ করলেও আমরা কিন্তু ঘুরেফিরে একই সিদ্ধান্তে ফিরে আসব। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কথা ধরা যাক। শহীদুল জহিরের উপমা ধার করে বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি যেন তার রচনাবলি জুড়ে অনবরত ঘাসের অঙ্কুরের মতো মাটি ভেদ করে উঠে আসে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন আঞ্চলিক ঘটনা হিসেবে না দেখে, যদি স্থানীয় সংগ্রাম ও বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহের পারস্পরিক প্রভাবে সংঘটিত একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে এই যুদ্ধকে উপজীব্য করে রচিত সাহিত্যকেও বিশ্বসাহিত্যের কাঠামোর মধ্যে পাঠ করা সম্ভব।
স্থানীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও শ্রেণিসংগ্রামের পাশাপাশি বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রবাহকে বিবেচনায় না নিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে বোঝার চেষ্টা করলে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ধারণা খণ্ডিতই থেকে যাবে। আবার, শুধুই শীতল যুদ্ধের রেষারেষি, উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম কিংবা আন্তঃদেশীয় আদর্শিক আদান-প্রদানের মতো বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের আলোকে ব্যাখ্যা করাই যথেষ্ট নয়।
ইতিহাসবিদ শুভ বসুর মতে, মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত কৃষক বিক্ষোভ, শ্রমিক আন্দোলন ও ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের মতো ঘটনাগুলোকে উপেক্ষা করে মুক্তিযুদ্ধকে ব্যাখ্যা করলে বাংলাদেশের জনগণের ভূমিকা বা ‘এজেন্সি’ অস্বীকার করা হয়। ‘ইন্টিমেশন অব রেভল্যুশন’ (কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০২৩) গ্রন্থে শুভ বসু একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে স্থানীয় ও বৈশ্বিক বিষয়-আশয়ের পরিপ্রেক্ষিতে সুনিপুণভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।
আমাদের আলোচ্য বিদ্বজ্জনও একাত্তরের প্রসঙ্গ টেনেছেন। শহীদুল জহিরকে ‘তৃতীয় শ্রেণির’ লেখক আখ্যা দেওয়ার সপক্ষে তিনি দুটি যুক্তি হাজির করেন। এক, জহিরের লেখায় মুক্তিযুদ্ধের চিত্রায়ন ‘সম্পূর্ণ ফলস’; দুই, জহিরের ভাষা অত্যন্ত ‘বোরিং’। বিদ্বজ্জন নিজে লেখেন সংস্কৃতনির্ভর সাধু ভাষায়। যার আরেক নাম ‘শুদ্ধ ভাষা’। কথ্য-চলিত ভাষাকে দার্শনিক রচনার জন্য অনুপযুক্ত বলেও মনে করেন তিনি। ভাষাগত শুচিতা বা কৌমার্য রক্ষার প্রতি যার এতখানি তাড়না, তার কাছে শহীদুল জহিরের গালিগালাজে ঠাসা, কৃত্রিমতাবর্জিত, জীবনঘনিষ্ঠ আন্তরিক গল্পবয়ান অস্বস্তিকর ঠেকবে, এতে বিস্ময়েরই বা কী আছে? যদিও ঢাকা শহরের বহু গেরস্ত বাড়িতে এমন বুলি দিব্যি চলে, অচেনা তো নয়-ই।
তাছাড়া, ইতিহাস উপস্থাপনে ভুল আছে বলে বিদ্বজ্জন যে মামলা ঠুকেছেন এবং তার সপক্ষে তিনি যে একটিমাত্র সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করেছেন, সেই সাক্ষ্যপ্রমাণটিও একটি ভুল অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। মানে, অমূলক ধারণা। অমূলক শঙ্কাও বটে। বিদ্বজ্জনের অভিযোগ, ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ (মওলা ব্রাদার্স, ১৯৮৮) উপন্যাসে রাজাকার চরিত্রদের টুপি পরিয়ে নিছক গৎবাঁধা ও অতিসরলীকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যদিও গোটা উপন্যাসের কোথাও কোনো টুপির উল্লেখই নেই, রাজাকার তো দূরের কথা।
এমন কি হতে পারে যে, তিনি রাজাকার সম্পর্কে তার নিজেরই পূর্বনির্ধারিত ধারণা উপন্যাসের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন? শত হোক, জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমকে ফটোগ্রাফে খুব কম সময়ই টুপিহীন অনাবৃত মস্তকে দেখা গেছে—তা সে ‘শান্তি কমিটি’ গঠনের উদ্দেশ্যে জেনারেল টিক্কা খানের সঙ্গে বৈঠকের সময় তোলা ছবিই হোক, কি তার মৃত্যুর কিছু সময় আগে তোলা ছবিই হোক।
উপন্যাসটির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানে হলো এরশাদ আমলের নানাবিধ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে অস্বীকার করা—যুদ্ধের পরপরই স্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের অনেকেই পুনর্বাসিত হয়; কেউ কেউ রাজনৈতিক ক্ষমতাও ফিরে পায়। সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জেনারেল এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বে ৭ দলীয় জোট এবং জামায়াতে ইসলামী একত্রে এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে।
অতঃপর নাটকের দৃশ্যপটে পরিবর্তন আসে। স্বাধীনতার সপক্ষের জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণি ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজাকারদের মধ্যকার শত্রুতা বিলীন হয়ে যায়। দুইপক্ষ ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে সামরিক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের শাসনকে বৈধতা দেয়। ক্ষমতা ভাগবাটোয়ারার প্রশ্নে সুযোগ বুঝে সংঘাত শেষ পর্যন্ত স্বার্থসংশ্লিষ্ট সহযোগিতায় পরিণত হয়। কিন্তু এই পুরো সমীকরণে সাধারণ মানুষ কোথায়? এখানেই জহিরপাঠ খুলে দেয় দেখার এক নতুন দৃষ্টিকোণ—যদি আগ্রহ থাকে জানার, ফিরে দেখার।
শাহরোজা নাহরিন: শহীদুল জহিরের গল্পের অনুবাদক। বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ায় তুলনামূলক সাহিত্য ও দক্ষিণ এশীয় সাহিত্যের ইতিহাস বিষয়ে পিএইচডি গবেষণা করছেন।