ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসতে পারেন পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের গ্রাম
‘আমার বাড়ি যাইও ভ্রমর, বসতে দিবো পিঁড়ে/ জলপান যে করতে দেবো শালি ধানের চিড়ে’। পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের এই লোকজ আহ্বান যেন আজও টেনে নেয় ভ্রমণপিপাসু মানুষকে।
ঈদুল আজহার ছুটিতে পরিবার নিয়ে ঘুরতে চাইলে ফরিদপুরের গোবিন্দপুরে কবির বাড়ি ও সংগ্রহশালা হতে পারে ব্যতিক্রমধর্মী এক গন্তব্য।
১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি ফরিদপুর সদরের তাম্বুলখানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন পল্লীকবি জসীম উদ্দীন। ১৯৭৬ সালের ১৪ মার্চ তিনি মারা যান। পরে তাকে সমাহিত করা হয় ফরিদপুর শহরতলীর গোবিন্দপুর গ্রামে কুমার নদের পাড়ে পারিবারিক কবরস্থানে এক ডালিম গাছের নিচে। ছায়াঘেরা শান্ত পরিবেশে চিরশায়িত আছেন শ্যামল বাংলার এই কবি।
নিজের বিখ্যাত ‘কবর’ কবিতায় তিনি লিখেছিলেন, ‘এইখানে তোর দাদির কবর ডালিম গাছের তলে/ ত্রিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।’
কবিতার সেই চিত্রকল্প যেন বাস্তব হয়ে উঠেছে কবির পারিবারিক কবরস্থানে। সমাধির পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়ালে কবির কবিতার গ্রামবাংলাকে নতুন করে অনুভব করা যায়।
কেন যাবেন
ঈদের ছুটিতে যাদের গ্রামের প্রকৃতি বা স্বল্প দূরত্বে ভ্রমণের পরিকল্পনা আছে, তাদের জন্য গোবিন্দপুর হতে পারে শিক্ষামূলক ও আবেগঘন এক গন্তব্য। সাহিত্য, প্রকৃতি ও ইতিহাস মিলিয়ে পল্লীকবির স্মৃতিধন্য এ গ্রাম দর্শনার্থীদের জন্য তৈরি করে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা।
এছাড়া ফরিদপুরে গেলে দেখতে পারেন নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট, মধুখালী উপজেলার ‘মথুরাপুর দেউল’ ও ‘বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ স্মৃতি জাদুঘর ও পাঠাগার’, সদরপুর উপজেলার ‘বাইশরশি জমিদারবাড়ি’। শহরের জনপ্রিয় খাবারের মধ্যে রয়েছে বাগাটের দই ও তেতুলতলার রসগোল্লা।
যা দেখবেন
প্রায় এক একর জমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে কবি জসীম উদ্দীনের বাড়ি। সেখানে গেলে গ্রামবাংলার নীরব সৌন্দর্য যেন আলতো করে ছুঁয়ে যায় দর্শনার্থীকে। মাটির উঠান, টিনের ঘর, কাঠের দরজা আর সাদামাটা নির্মাণশৈলী এখনও বহন করছে শতবর্ষ আগের পল্লীজীবনের আবহ। চারপাশে পাখির ডাক আর নিরিবিলি পরিবেশে মনে হবে, কবির কবিতার সেই গ্রাম এখনও বেঁচে আছে।
এই উঠানেই হয়তো কবি শৈশবের বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতেন, কিংবা একা বসে অনুভব করতেন পল্লীর নিস্তব্ধ রূপ। ঘুরে বেড়ালে মনে হবে, তার চোখের সামনে এখনও ভেসে আছে নদী, মাঠ আর জনপদের জীবন।
বাড়িটির বিভিন্ন ঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে কবির লেখা, স্মৃতিকথা, চিঠিপত্র ও আলোকচিত্র। বড় প্রিন্টে টানিয়ে রাখা হয়েছে তার সাহিত্যকর্মের নানা অংশ। বাড়ির উত্তর পাশেই রয়েছে পারিবারিক কবরস্থান, যেখানে ডালিম গাছের নিচে চিরশায়িত আছেন পল্লীকবি। তার পাশে শায়িত রয়েছেন বাবা-মা, স্ত্রী, বড় ছেলে, বড় ছেলের স্ত্রীসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। বাড়িতে প্রবেশমূল্য ২০ টাকা।
কবির বাড়ির পাশেই সরকারি উদ্যোগে চার একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে ‘পল্লীকবি জসীম উদ্দীন কমপ্লেক্স ও সংগ্রহশালা’। কুমার নদের তীরে নির্মিত এ কমপ্লেক্সে কবির জীবন, সাহিত্য ও গ্রামীণ সংস্কৃতির নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে।
এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে কবির ব্যবহৃত ব্যক্তিগত সামগ্রী, হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি, বিরল আলোকচিত্র, প্রকাশিত বই ও নানা স্মারক। রয়েছে কবিকে লেখা চিঠিও। গ্যালারি ভবন, লাইব্রেরি, অফিস ভবন ও উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক মঞ্চসহ মোট চারটি স্থাপনা রয়েছে কমপ্লেক্সে।
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের অর্থায়নে পরিচালিত এ সংগ্রহশালায় প্রায় ১৬০টির বেশি প্রদর্শিত নিদর্শন ও ৩৩টি সংরক্ষিত বস্তু রয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে পল্লীকবির সাহিত্য, লোকজ সংস্কৃতি ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে। কমপ্লেক্সের ভেতরে রয়েছে বড় মুক্তমঞ্চ এবং সবুজ খোলা চত্বর, যেখানে পরিবার নিয়ে সময় কাটানো যায়।
সংগ্রহশালা সাধারণত সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। প্রবেশমূল্য ২০ টাকা।
সংগ্রহশালার বিক্রয় সহকারী লুৎফর রহমান মোল্লা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, বিশেষ কারণ ছাড়া সংগ্রহশালা প্রতিদিনই খোলা থাকে। সাধারণ সময়েও প্রতিদিন শতাধিক দর্শনার্থী আসেন। ঈদ ও সরকারি ছুটিতে দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও বেড়ে যায়।
ফরিদপুরের লেখক ও গবেষক মফিজ ইমাম মিলন বলেন, জসীম উদ্দীনকে জানতে হলে তার গ্রামে আসতে হবে। এখানকার প্রকৃতি ও পরিবেশেই তার কবিতার প্রাণ লুকিয়ে আছে। ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’, ‘নকশী কাঁথার মাঠ’, ‘সুচয়নী’, ‘বেদের মেয়ে’, ‘বাঙালীর হাসির গল্প’ ও ‘যে দেশে মানুষ বড়’-এর মতো অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন পল্লীকবি। ‘কবর’ ও ‘আসমানী’ আজও পাঠকের মুখে মুখে ফেরে।
কোথায় থাকবেন
ফরিদপুরে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় রাতযাপনের সুবিধা রয়েছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় রয়েছে সার্কিট হাউস, সড়ক বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেস্ট হাউস।
আর বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় রয়েছে শহরের গোয়ালচামট মহল্লার হোটেল র্যাফেলস ইন, মুজিব সড়কের নীলটুলিতে পদ্মা হোটেল, হোটেল জে কে ইন্টারন্যাশনালসহ কয়েকটি আবাসিক হোটেল। এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে সিঙ্গেল, এসি ও ডিলাক্স কক্ষ পাওয়া যায়।
কী খাবেন
দেশীয় খাবারের জন্য শহরের গোয়ালচামট মহল্লায় রয়েছে সুইট রেস্টুরেন্ট, আলীপুর মোড়ের পাঁচ তারা হোটেল, নীলটুলির ধানসিঁড়ি হোটেল এবং সুপার মার্কেট এলাকার খন্দকার হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট।
এছাড়া চরকমলাপুরের সিরিন গার্ডেন রেস্টুরেন্ট, ঝিলটুলির ডোলসে ভিটা, টেরাকোটা চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, কাচ্চি ভাই ও সুলতানস ডাইনে বাংলা ও বিদেশি বিভিন্ন খাবার পাওয়া যায়। শহরের রাজেন্দ্র কলেজের পাশ, আলীপুর ব্রিজ এলাকা ও অম্বিকা ময়দানের আশপাশে কম খরচেও বিভিন্ন ধরনের খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে।
যেভাবে যাবেন
ফরিদপুর জেলা শহর থেকে গোবিন্দপুর গ্রামের দূরত্ব প্রায় পাঁচ থেকে ছয় কিলোমিটার। শহরের আলীপুর মোড় বা জনতা ব্যাংক মোড় থেকে অটোরিকশা, ইজিবাইক কিংবা রিকশায় ১৫ থেকে ২০ মিনিটে সেখানে পৌঁছানো যায়। জনপ্রতি রিকশা ভাড়া ২০ থেকে ৩০ টাকা। ইজিবাইক রিজার্ভ নিলে খরচ পড়বে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা।
ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে সরাসরি বাসে ফরিদপুর নতুন বাসস্ট্যান্ডে নামা যায়। বিআরটিসি, সূর্যমুখী পরিবহন, গোল্ডেন লাইনসহ বিভিন্ন পরিবহনের বাস এ পথে চলাচল করে। গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকেও দৌলতদিয়া হয়ে ফরিদপুরগামী বাস নিয়মিত পাওয়া যায়। বাসে ঢাকা থেকে ফরিদপুর যেতে ভাড়া লাগে মানভেদে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা।
এছাড়া কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে সুন্দরবন এক্সপ্রেস, মধুমতি এক্সপ্রেস ও বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে ফরিদপুর আসা যায়। আসনভেদে ট্রেনের ভাড়া ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা। ফরিদপুর রেলস্টেশন কিংবা নতুন বাসস্ট্যান্ড থেকে রিকশায় আলীপুর ব্রিজের পাশ হয়ে সহজেই পৌঁছানো যায় কবির বাড়ি ও সংগ্রহশালায়।