মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের গোপন ঘাঁটি থেকে যেভাবে অভিযান চালানো হয়
ইরাকের জনমানবশূণ্য নাজাফ মরুভূমিতে সাদ্দাম হোসেনের একটি পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটিতে গোপনে আস্তানা গেড়েছিল ইসরায়েলি বাহিনী। একজন ইরাকি মেষপালকের চোখে প্রথম ধরা পড়ে আস্তানাটি। পরবর্তীতে বিভিন্ন অনুসন্ধান ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে সেখানে ইসরায়েলি গোপন তৎপরতার তথ্য সামনে আসে।
তবে এটিই একমাত্র নয়, ইসরায়েলের এমন গোপন কর্মকাণ্ড যে আরও অনেক দেশে বিস্তৃত সে সম্পর্কে অনেকের ধারণা থাকলেও তথ্য-প্রমাণের অভাবে তা কখনো প্রকাশ করা যায়নি।
সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন একাধিক সূত্রের বরাতে মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশে ইসরায়েলের এমন গোপন আস্তানার খবর প্রকাশ করেছে।
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরাক ছাড়াও আজারবাইজান, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও আফ্রিকার সোমালিল্যান্ডের মতো দেশে ইসরায়েলের একাধিক গোপন সামরিক ঘাঁটি ও আস্তানা রয়েছে।
গোপন ঘাঁটির সুবিধা
মধ্যপ্রাচ্যে বা ইরানের আশপাশে এসব গোয়েন্দা ঘাঁটির মাধ্যমে মূলত ইরানের সামরিক গতিবিধি, বিভিন্ন পারমাণবিক বা সামরিক স্থাপনার তথ্য এবং ইরান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়লে তার আগাম সতর্কবার্তা পেত ইসরায়েল।
একইসঙ্গে এসব ঘাঁটির মাধ্যমেই ইরানের দক্ষিণ, পশ্চিম ও উত্তর সীমান্তজুড়ে অবস্থান নিতে পেরেছে ইসরায়েলি বাহিনী। শুধু তাই নয়, তেহরান থেকে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার দূরে থেকেও ইরানের মূল ভূখণ্ডের ভেতরে একের পর এক ইসরায়েলের বিমান হামলার রহস্যও পরিষ্কার হয়।
প্রাথমিকভাবে এসব ঘাঁটি জরুরি পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিমানের পাইলটদের উদ্ধারের নামে তৈরি করলেও পরবর্তীতে প্রত্যেকটির পরিধি বাড়িয়ে সামরিক ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করে ইসরায়েল।
আজারবাইজানে ঘাঁটিতে কী হতো
চারটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে সিএনএন জানায়, ইরান যুদ্ধের সময় আজারবাইজানে গোপনে নিজেদের এলিট সামরিক ও গোয়েন্দা ইউনিট মোতায়েন করেছিল ইসরায়েল।
ইরান সীমান্ত সংলগ্ন আজারবাইজানের দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকটি এলাকায় অবস্থান নিয়ে কাজ করে এসব সামরিক গোয়েন্দারা। ইরানের উত্তরাঞ্চলের ভেতরে নজরদারি চালানো ছিল তাদের অন্যতম কাজ।
একটি সূত্রের দেওয়া তথ্য মতে, আজারবাইজান থেকে চালানো অভিযানে ইসরায়েলের স্পেশাল অপারেশন ফোর্সের সদস্য, হেলিকপ্টার-ভিত্তিক এলিট উদ্ধারকারী দল এবং গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের কর্মকর্তা মিলিয়ে কয়েক ডজন সদস্য অংশ নিয়েছিল।
অন্য আরেকটি সূত্র বলছে, এই দলে বিশেষ কমান্ডো ইউনিটও ছিল। তারা মূলত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং ড্রোন পরিচালনার কাজ করত।
প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি ঘাঁটি ছিল ইরানের তাবরিজ শহর থেকে মাত্র ৬০ মাইল দূরে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের সময় এই তাবরিজ শহরেই বড় ধরনের হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েল।
যেভাবে তৈরি হয়েছে গোপনে ঘাঁটি
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগেই গোপন ঘাঁটি তৈরির প্রস্তুতি শুরু করে ইসরায়েল।
দুটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারির মাঝামাঝিতে ইরানে যখন ব্যাপক বিক্ষোভ চলছিল, তখনই আজারবাইজান-ইরান সীমান্তে আড়িপাতার যন্ত্র ও আধুনিক গোয়েন্দা সরঞ্জাম স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় ইসরায়েল।
ইসরায়েলের পরিকল্পনা ছিল জানুয়ারির মাঝামাঝিতে ইরানে বিমান হামলা শুরু করা। এই হামলার আড়ালে তারা আজারবাইজান-ইরান সীমান্তে ঘাঁটি তৈরি করবে।
কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ মুহূর্তে ওই সময়ে হামলার পরিকল্পনা বাতিল করেন।
এ অবস্থায় ইসরায়েল একাই গোপন ঘাঁটির পরিকল্পনা এগিয়ে নেয়। এর কারণ, ইসরায়েল বিশ্বাস করতো—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা ব্যর্থ হবে। তাই গোপন মিশন চালু রাখে তারা।
রাডার ফাঁকি দিতে পারে এমন যুদ্ধবিমান ও বিশেষ বাহিনীকে ব্যবহার করে ইরান সীমান্তে আড়িপাতার যন্ত্রসহ আনুষাঙ্গিক সামরিক সরঞ্জাম স্থাপন করে ইসরায়েল।
সবচেয়ে বড় যে অভিযান চালানো হয়
একটি সূত্রের দাবি, আজারবাইজান থেকে চালানো সবচেয়ে বড় অভিযানগুলোর একটি ছিল ৪ মার্চে। সেদিন ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান রহমান মোঘাদ্দামকে হত্যা করা হয়।
ইসরায়েলের দাবি, ২০২৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যা চেষ্টার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন এই মোঘাদ্দাম।
ওই অভিযানের দুদিন পর ৬ মার্চ আজারবাইজানের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থা ঘোষণা করে, আইআরজিসির একটি চক্রান্ত নস্যাৎ করেছে তারা। তাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও ইসরায়েলে হামলা চালানোর চেষ্টা চালিয়েছিল ইরান।
যদিও কয়েক সপ্তাহ পর ইসরায়েল প্রকাশ্যেই স্বীকার করে যে, এটি ছিল মোসাদ, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও আজারবাইজানের নিরাপত্তা সংস্থার একটি যৌথ অপারেশন।
ওয়াশিংটনে নিযুক্ত আজারবাইজানের দূতাবাসের এক মুখপাত্র তাদের ভূখণ্ড ব্যবহারের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
সোমালিল্যান্ডে গোপন ঘাঁটি
একটি সূত্রের বরাতে সিএনএন জানায়, ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ অঞ্চলে অবস্থিত ‘স্বাধীনতাকামী ভূখণ্ড’ সোমালিল্যান্ডেও গোপন সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেছে ইসরায়েল। বেরবেরা বন্দর নগরীতে ইসরায়েলের বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে।
দূরপাল্লার অভিযানে যাওয়ার সময় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো সেখান থেকে জ্বালানি নিতো বা যাত্রা বিরতির জন্য ব্যবহার করতো।
গত ডিসেম্বরে ইসরায়েলই প্রথম দেশ হিসেবে সোমালিল্যান্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়।
সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েলের গোপন ঘাঁটির বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
আমিরাতে গোপন কর্মকাণ্ড
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের বরাতে সিএনএন জানায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতে গোপনে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ ও তা চালানোর জন্য সেনা পাঠিয়েছিল ইসরায়েল।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গোপনে ইউএই সফর করেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, মোসাদ প্রধান ও ইসরায়েলি সেনাপ্রধান। যদিও আমিরাত সরকার এই সফরের খবর জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে।
ইরাকে দুটি গোপন ঘাঁটি
ইরাক সরকারের অনুমতি ছাড়াই দেশটির ভেতরে দুটি গোপন ঘাঁটি তৈরি করেছিল ইসরায়েলি বাহিনী। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও নিউইয়র্ক টাইমস গত ১০ মে প্রথম ইরাকের এই দুটি ঘাঁটির কথা প্রকাশ করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই ঘাঁটিগুলো মূলত রসদ সরবরাহ, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও উদ্ধার অভিযানে ব্যবহৃত হতো।
সম্পর্কের আড়ালে চলছে লবিং
বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক যে সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ, এটি সবার জানা। তবে এই সম্পর্ককে অন্যরা তাদের নিজস্ব স্বার্থেও ব্যবহার করে।
বলা হয় যে, ইসরায়েলের সঙ্গে অনেক দেশের সম্পর্কের মূলে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধা পাওয়া বা ওয়াশিংটনে চুক্তি বা নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে ইসরায়েলি লবিংকে কাজে লাগানো।
ইসরায়েলের সঙ্গে আজারবাইজানের গভীর সম্পর্কের অন্যতম একটি বড় কারণ এটি।
স্বাধীন গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক জোশুয়া কুচেরার মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে বড় কূটনৈতিক সুবিধা পায় আজারবাইজান। ওয়াশিংটনে থাকা ইসরায়েলি লবিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে বাকু।
কুচেরা আরও বলেন, আজারবাইজান নিজেকে একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আর আরব দেশগুলোর মধ্যে একটি সেতু বা মাধ্যম হিসেবে বাকুকে কাজে লাগাতে চায় ইসরায়েল।
এছাড়া বাণিজ্যিক ও সামরিক স্বার্থ রক্ষার বিষয়ও রয়েছে। আজারবাইজান ইসরায়েলকে তাদের প্রয়োজনীয় তেলের একটি বড় অংশ সরবরাহ করে। বিনিময়ে ইসরায়েল আজারবাইজানের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র বিক্রি করে, যা ২০১৬ ও ২০২০ সালে আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহার করেছিল বাকু।
আর এসবের বিনিময়ে ইরানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আজারবাইজানের ভূখণ্ড ব্যবহার করেছে ইসরায়েল।
ইসরায়েলভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘বেগিন সাদাত সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের’ ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ গারসন কোগানের মতে, আজারবাইজানে ইসরায়েলের কৌশলটি ইচ্ছাকৃতভাবেই খুব গোপন রাখা হয়। এটি মূলত অস্ত্র সরবরাহ, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও নিরাপত্তা খাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর ভিত্তি করে চলে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব ঘটনাই প্রমাণ করে যে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশীরা কতটা জড়িত। তবে সব গোপন কর্মকাণ্ড যে সরকারের অনুমতিতে ঘটেছে তা নয়, অনেক কিছুই প্রশাসনের অজান্তেও ঘটেছে।