হাম শুধু ফুসকুড়ি ও জ্বর নয়, বিপত্তি ঘটে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থায়
হাম সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। অথচ এই রোগটিই এখন দেশে সম্ভাব্য বড় এক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে হামে ও এরকম উপসর্গ পাওয়া গেছে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের। এর মধ্যে পাঁচ শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একসময় নিয়ন্ত্রণে থাকা রোগটি এখন নতুন করে প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে।
যতটা সাধারণ ভাবা হয়, তার চেয়েও বিপজ্জনক
হাম কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা নিয়ে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। এটি মানব ইতিহাসে সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। এর সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এটি আক্রান্ত ব্যক্তির রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেমকে ধ্বংস করে দেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, হাম মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার যে ক্ষতি করে তা এইচআইভি সংক্রমণের সমতুল্য।
হামে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় রোগী সহজেই বিভিন্ন জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হন। হাম হলে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণে বাড়ে। ভাইরাসটি ফুসফুসের কোষ নষ্ট করে দেয়। সেই সুযোগে ফুসফুসকে ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করে। এতে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। অনেক শিশুকে আইসিইউতে রেখে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
এ ছাড়া হাম মস্তিষ্কেও মারাত্মক ক্ষতি করে। সংক্রমণের সময় বা পরে মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) হতে পারে। কিছু বিরল ক্ষেত্রে সুস্থ হওয়ার কয়েক বছর পরও ‘এসএসপিই’ নামের একটি স্নায়বিক রোগ দেখা দিতে পারে। এই রোগও রোগীকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে টেনে নেয়। এর সঙ্গে ডায়রিয়া ও মারাত্মক অপুষ্টির ঝুঁকি তো আছেই।
ঝুঁকিতে কারা
টিনা না নিলে সব বয়সী মানুষ হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকলেও সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে পাঁচ বছরের কম বয়সী, অপুষ্টিতে ভোগা এবং ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতিতে থাকা শিশুরা।
হামের সুনির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। শুরুতে জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া ও ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়। চিকিৎসকেরা শরীরে ফুসকুড়ি ওঠার আগেই মুখের ভেতর ‘কপলিক স্পট’ বা ছোট সাদাটে দাগ দেখে রোগটি চিনে ফেলতে পারেন। অসুস্থতার চতুর্থ বা পঞ্চম দিনে মুখ থেকে শুরু হয়ে সারা শরীরে ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়ে।
টিকা দিতে না পারায় ফিরেছে হাম
হাম নিয়ন্ত্রণে একসময় বৈশ্বিক রোলমডেল ছিল বাংলাদেশ। ২০১৩ সালেই হামজনিত শিশুমৃত্যু উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে এনেছিল দেশটি। সেই অর্জন এখন হুমকির মুখে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, কোভিড মহামারির পর নিয়মিত টিকাদানে ব্যাঘাত এবং মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতিই হামের প্রত্যাবর্তনের মূল কারণ।
দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪-২৫ সালে টিকার সংকট, টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন এবং টিকা কেনায় দেরি হওয়ার কারণেই হাম এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কর্মসূচিতে অনিয়ম। হামে আক্রান্ত হলে শরীরে ভিটামিন ‘এ’ দ্রুত কমে যায়। এটি মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
যেভাবে মোকাবিলা
যেহেতু হামের নির্দিষ্ট ওষুধ নেই, তাই টিকাই এই রোগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আক্রান্ত রোগীকে উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসার পাশাপাশি পর্যাপ্ত পুষ্টি ও ভিটামিন ‘এ’ দিতে হয়। ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ ঠেকাতে লাগে অ্যান্টিবায়োটিক।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, হামের এই বিপর্যয় রুখে দিতে হলে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুর দুই ডোজ টিকা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। পাশাপাশি টিকার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং দেশব্যাপী ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচি পুনরায় জোরদার করা জরুরি। প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে আর কোনো শিশুর প্রাণ যেন অকালে ঝরে না যায়, সে জন্য সমন্বিত ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার এখনই সময়।

