গল্প

বাড়ি খুঁজছে ভুতোম ভূত!

নাসরীন মুস্তাফা
নাসরীন মুস্তাফা

আজ সকালে ভুতোম ভূত এসেছিল আমার অফিসে। মানুষের মতো দেখতে। খ্যাসখেসে গলা! শুনলে মনে হয়, খুব রেগে আছে। বলল, আমি ভুতোম ভূত। শ্যাওড়া গাছে আর ভাল লাগছে না। ছানাপোনা নিয়ে থাকার মতো বাড়ি খুঁজছি।

আমি ইঞ্জিনিয়ার মানুষ। রড-সিমেন্ট-কংক্রিটের হিসাব বুঝে বাড়ি বানাই। ভূতের বাড়ি বানাতে হবে ভেবেছি কখনো? 
জম্পেশ এক পোড়ো বাড়ি দেখিয়ে ঝামেলা শেষ করতে চাইলাম। ওম্মা! ভুতোম ভূত তো রেগে মহাভূত! 

: দিন দিন মানুষের বুদ্ধি বাড়ছে না কমে যাচ্ছে, ভাবছি। দুই হাজার বছর আগে বানানো দালানকোঠা দিব্যি আছে। আর একালে পঞ্চাশ বছর পেরুলেই দালানের দফারফা।

ভূতের মুখে এরকম কথা শুনে মাথা চুলকাই। আর ভুতোম ভূত ভাবে, আমি বিশ্বাস করছি না। রাগে গরগর করে।

: দুই হাজার বছর আগে রোমানরা এক মন্দির বানাল। নাম দিয়েছিল-প্যানথিয়ন। আমি তখন হাজার বছরের নাদান বাচ্চা। মায়ের কোলে চড়ে দেখেছিলাম। সে-ই প্যানথিয়ন এখনও আছে। বিশ্বাস হচ্ছে না? গুগলকে জিগ্যেস করো। টাকা পয়সা আছে? থাকলে প্লেনের টিকিট কেটে দেখে এসো।

প্যানথিয়নের টিকে থাকার খবর ইঞ্জিনিয়ারদের রাখতে হয়। ভুতোম ভূত সে খবর রাখলে তো! পায়চারি করছিল। সামনে এসে দাঁড়ালো কঠিন প্রশ্ন নিয়ে। 

: তোমরাও তো কংক্রিট দিয়ে দালান বানাও। তোমাদের দালানকোঠা টেকে না কেন?

ভুতোম ভূতকে চেয়ার এগিয়ে দিই। ভাবখানা এমন, সমস্যাটা নিয়ে বসে আলাপ করা যাক। তা সে চেয়ার চেয়ারের জায়গায় থাকল। আমিই থাকলাম না জায়গায়। ঝটকা টান টের পেয়েছিলাম। এরপর আকাশে উড়ছি, শোঁ শোঁ বাতাস কেটে উড়ছি… এরপর ধপ করে মাটিতে পা। একটা বাড়ির কাজ ধরেছিলাম গত মাসে। সেখানে এনেছে ভুতোম ভূত… চোখের পলকে। 

নির্মাণ শ্রমিকরা ব্যস্ত। কাজ করে আর গান গায়। 

আমরা কংক্রিট বানাই!
সিমেন্ট, বালু, খোয়ার সাথে 
মাইপ্যা পানিও মেশাই।
শুকাইলে পাথ্থর হইয়া যায় 
আমরা কংক্রিট বানাই!

ভুতোম ভূত দরদি কণ্ঠে শ্রমিকদের গানে গলা মেলায়। আমি ভাবছি। একালের সিমেন্ট তৈরিতে মূল কাঁচামাল চুনাপাথর। খনি থেকে তুলে এর সাথে কাদামাটি, সিলিকা, লোহা মেশায়। এই মিশ্রণ অন্নেক তাপে পুড়িয়ে চুন… চুন থেকে সিমেন্ট।

হাতে তাল দিচ্ছিল ভুতোম ভূত। কখন যেন আমার মাথাকে তবলা বানিয়ে ফেলেছে। মাথার ভেতরে শিলা পড়ছে। আগ্নেয় শিলা। ইতালির আগ্নেয়গিরিগুলো জেগে উঠেছে। আগুনের সাথে বেরিয়ে আসছে গলিত পাথর। সেগুলো ঠাণ্ডা হলেই হয় আগ্নেয় শিলা। 

মাথার ভেতরে গানও শুনছি। গাইছে কারা? দুই হাজার বছর আগেকার রোমান নির্মাণ শ্রমিকরা? গানটা এরকম-

আমরা কংক্রিট বানাই!
পোজোলানার খোয়ার সাথে 
চুন আর সাগরের পানি মেশাই।
শুকাইলে পাথ্থর হইয়া যায়
আমরা কংক্রিট বানাই!

রোমানরাও চুন ব্যবহার করত। এটাই কাজ করত সিমেন্টের। ইটের বা পাথরের খোয়ার জায়গায় ওরা কী নিত? আগ্নেয় শিলা পাথরের খোয়া। এর নাম পোজোলানা। ইতালির পোজ্জুওলি শহরে পাওয়া গিয়েছিল প্রচুর পরিমাণে। লোকরা নাম মিলিয়ে নাম রাখল। 

: চুন আর পোজোলানা, রোমান কংক্রিটের জাদুটোনা।

ভুতোম ভূত একথা বলে খুব খুশি। আমি বাঁচলাম মাথাটা ছেড়েছে বলে। খুশিও হয়েছি। পোজোলানা কাজে লাগানোর রোমান বুদ্ধিটা দারুণ। এলাকায় পাওয়া যায়, এমন জিনিস কাজে লাগানো উচিত। খরচ কম পড়ে।

: তোমাদের দেশে বাঁশ গাছ প্রচুর। তাই বলে রডের বদলে বাঁশ দিও না কিন্তু। রডের শক্তি আর বাঁশের শক্তি এক নয়। মনে রেখ।

অবশ্যই মনে রাখি। খবরের পাতায় পড়েছি রডের বদলে বাঁশ ব্যবহারের খবর। যারা করেছে, তাদের শাস্তি দিতে হবে। জোর গলায় এসব নিয়ে বললাম। ভুতোম ভূত একটু খুশি হলো মনে হয়। বলে, তোমাকে দিয়ে হবে, যদি–
যদি?

: রোমান কংক্রিটের মত কংক্রিট বানাতে পার। দালানকে শক্তি দেয়। দালানের শরীরে ফাটল ধরলে ঠিক করে দেয়।
ভাবা যায়! কংক্রিটকে জীবন্ত লাগে শুনলে। কীভাবে সম্ভব?

বহু বছর ধরে জানার চেষ্টা চলছে। গবেষকরা গবেষণা করছেন রোমান কংক্রিট নিয়ে। চুনের ছোট ছোট খণ্ডগুলো দেখে মনে হতো এলোমেলো। মনে হতো, কংক্রিট তৈরির সময় ভালভাবে মেশানো হয়নি। নির্মাণ শ্রমিকদের কাজের মান ভাল না হয়তো কিন্তু না…খটকা লাগত। বহু শত বছর ধরে রোমানরা এত এত কিছু বানিয়েছে। তারা ভালভাবে মেশাতে পারেনি চুনের দলা! নাকি এর পেছনে কোন কারণ আছে? আচ্ছা, চুন তো চুন-ই, না কি?

এমআইটির এক গবেষণায় নিশ্চিত হওয়া গেছে। রোমানরা কলিচুন ব্যবহার করত। চুনে পানি মেশালে কলিচুন হয়। ভুতোম ভূত নাকি এ কথা জানত। মানুষ জানে না, এটা অবশ্য জানত না।

কংক্রিটে ফাটল ধরলে… ফাটলের ভেতর পানি ঢুকে চুনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে। চুনের দলা গলে যায়। একটু পর শুকিয়ে আবারও শক্ত হয়ে যায়। বুজে যায় ফাটল। পানি আর ভেতরে ঢুকতে পারে না।

ভুতোম ভূতকে পোড়ো বাড়ি দেখিয়েছিলাম। দেওয়ালের ফাটল দেখিয়ে বাড়িটা যেন কাঁদছিল। সে কথা মনে করে মনটা খারাপ হলো। মন খারাপ হলো ভুতোম ভুতেরও। 

: তোমরা নিজেদেরকে সেরা বল। বানাও না অমন কংক্রিট। বানাও না।

আমি বলেছিলাম রডের কথা। বাড়ি পোড়ো বানাতে রডেরও দায় আছে। মরিচা ধরে। আর দেখ, এখন মানুষ বেড়েছে। যত বেশি মানুষ কিনবে, তত লাভ। পঞ্চাশ একশ বছর ঠিক আছে, এর বেশি টিকবে দালান-সেতু? সিমেন্ট-রডের ব্যবসায় লালবাতি জ্বলবে তো।

আমার যুক্তি শুনে ভুতোম ভূতের চোখ লাল। রাগের চোটে একটা কথা বলল না। চলে গেল। শেওড়া গাছেই ফিরে গেল হয়তো।
আমিও শেওড়া গাছে ঠাঁই নেব কি না ভাবছি। সাধারণ বাড়িঘর বানাতে আর ভাল্লাগে না। পাঁচশ হাজার বছর টেকে এমন বাড়ি বানানোর স্বপ্ন দেখি। বছর বছর কত টাকা বাঁচবে তার হিসেব কষি। সেই টাকা শিশুদের কাজে লাগানো যায়। প্রাণ বাঁচানোর ঔষধ কেনা যায়।

অফিসে ফিরে দেখি সিমেন্ট কোম্পানির লোক এসেছে। বারো-তের জন হবে। সবার এক কথা, তার কোম্পানির সিমেন্টই সেরা। রড কোম্পানির লোকরাও আসে। রডের গুণ গায়।  

ঘাড় ধরে বের করে দিয়েছি। আরও দেব।

বিজ্ঞানীরা রোমান কংক্রিটের মত কংক্রিট বানাতে চেষ্টা করছেন। মরিচা পড়বে না এমন রড বানাতে চাইছেন। এসব খবর জানার চেষ্টা করি। এখন আমার এই একটাই কাজ। যেদিন সুখবর পাব, সেদিন বাড়ি বানাব। হাজার বছর টিকে থাকার মতো বাড়ি বানাব। ভুতোম ভূত যেখানেই থাকুক চলে আসবে নিশ্চিত। আমি আর ভুতোম ভূত পরিবার নিয়ে পাশাপাশি থাকব। কী দারুণ না ব্যাপারটা?