পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে খাগড়াছড়ির সাড়ে ৩ হাজার পরিবার, ২ প্রধান সড়ক তলিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

নিজস্ব সংবাদদাতা, খাগড়াছড়ি

টানা ভারী বর্ষণে একাধিক স্থান তলিয়ে যাওয়ায় মঙ্গলবার সকাল খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে খাগড়াছড়ির সঙ্গে রাঙ্গামাটির সরাসরি সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দীঘিনালা-রাঙ্গামাটির লংগদু সড়কের মেরুং হেডকোয়ার্টার এলাকা পানিতে ডুবে যাওয়ায় দুপুর থেকে ওই সড়কেও যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে আছেন জেলার ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার পরিবার।

গতকাল সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই টানা বৃষ্টিতে মহালছড়ি উপজেলার চব্বিশ মাইল, মাইসছড়ি ও কেরেঙ্গেনালা এলাকায় সড়ক হাঁটুপানিতে তলিয়ে গেছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

আজ সকাল সাড়ে ১০টায় মহালছড়ি উপজেলার মাইসছড়ি এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কটি হাঁটু থেকে কোমরপানিতে ডুবে আছে।

স্থানীয়রা জানান, সেচের নালার স্লুইসগেট বন্ধ থাকায় বৃষ্টির পানি সরতে না পারায় এ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। সড়কে আটকা পড়া বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে বাধ্য হয়ে পানি ডিঙিয়ে বাড়ি ফিরতে দেখা গেছে।

মহালছড়ি থেকে খাগড়াছড়ি আসার পথে মাইসছড়ি এলাকায় আটকা পড়েন যাত্রী শরিফুল ইসলাম। দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় এখানে এসে আটকে গেছি। এখন পানি কমার অপেক্ষায় আছি।’

দীঘিনালা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের বেলুন মেকার সুভূতি চাকমা ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আজ দুপুর ১টা পর্যন্ত গত ১৮ ঘণ্টায় এলাকায় ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।’

টানা বৃষ্টির কারণে জেলার চেঙ্গী ও মাইনী নদীসহ বিভিন্ন খাল ও ছড়ার পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুপুরের দিকে জেলা সদর, মহালছড়ি ও দীঘিনালার বিভিন্ন নিচু এলাকায় পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় জেলাজুড়ে বন্যার আশঙ্কাও রয়েছে।

পানিতে তলিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছে খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি ও  দীঘিনালা-রাঙ্গামাটির লংগদু সড়ক। ছবি: স্টার

এদিকে, লংগদু সড়কের মেরুং হেডকোয়ার্টার এলাকা পানিতে ডুবে যাওয়ায় দুপুর থেকে দীঘিনালা-রাঙ্গামাটি সড়কেও যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। মাইনী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে মেরুং এলাকার লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে।

খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. আনোয়ার সাদাত দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘যেকোনো ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনের সার্বিক প্রস্তুতি রয়েছে। শুকনো খাবার এবং পর্যাপ্ত সুপেয় পানি মজুত রাখা হয়েছে। বন্যাদুর্গত এলাকার আশপাশের স্কুলগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’  

পাহাড়ধসের শঙ্কা

ভারী বর্ষণের ফলে খাগড়াছড়িতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। শহরের কুমিল্লাটিলা এলাকার সড়কে পাহাড়ের মাটি ভেঙে পড়ায় একপাশ দিয়ে কোনোভাবে যান চলাচল করছে। তবে আজ দুপুর পর্যন্ত কোথাও বড় ধরনের ধসের খবর পাওয়া যায়নি।

পাহাড়ধসের আতঙ্কে দিন কাটছে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী হাজারো পরিবারের। ডিসি আনোয়ার সাদাত দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘পুরো জেলায় প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার পরিবার পাহাড়ধসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছেন। এই ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ হাজার।’

এসব এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে জেলা প্রশাসন থেকে মাইকিং করা হচ্ছে। বিশেষ করে জেলা শহরের শালবন, মোহাম্মদপুর সবুজবাগ, কুমিল্লা টিলা, কলাবাগান, ন্যান্সীবাজার, মোল্লাপাড়া ও কৈবল্যপিঠ এলাকার পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী শত শত পরিবারকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

ভারী বৃষ্টিতে গত কয়েকদিনে জেলার শালবন, খাগড়াপুর, কুমিল্লা টিলা, সবুজবাগ ও ঠাকুরছড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে বসতঘরের ক্ষতি বা প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটেনি। তবে টানা ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

এছাড়া রামগড়, লক্ষ্মীছড়ি, দীঘিনালা, মাটিরাঙ্গা, গুইমারা, পানছড়ি, মানিকছড়ি ও মহালছড়ি উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ধসের সম্ভাবনা রয়েছে। অনেক পরিবার পাহাড় কেটে ঝুঁকিপূর্ণ ঢালের নিচে কিংবা পাহাড়ের খুব কাছাকাছি বসবাস করছেন।

ডিসি আনোয়ার সাদাত আরও বলেন, ‘বন্যা বা পাহাড়ধসসহ যেকোনো দুর্যোগ এড়াতে আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এমনকি মাইকিং করে লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে অনুরোধ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি বুঝে প্রয়োজন হলে পাহাড়ের পাদদেশে থাকা মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে।’