বাজেট ২০২৬-২৭

বিদ্যুৎ ও সারে বাড়ছে ভর্তুকির চাপ

রেজাউল করিম বায়রন
রেজাউল করিম বায়রন

বিশ্ববাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), জ্বালানি তেল ও সারের দাম বাড়ায় আগামী অর্থবছরে সরকারের ভর্তুকির বোঝা আরও ভারী হতে যাচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে মোট ১ লাখ ২৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার ৫৫ শতাংশই যাবে বিদ্যুৎ ও সার খাতে।

চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। এরও অর্ধেকের বেশি ব্যয় হয়েছে বিদ্যুৎ ও সারে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারে এলএনজি, জ্বালানি তেল ও সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা এবং সার খাতে ২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে।

আগামী অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও সার ভর্তুকির জন্য মোট ৬৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। এর মধ্যে শুধু বিদ্যুৎ খাতেই থাকবে ৩৭ হাজার কোটি টাকা।

তবে বিদ্যুৎ বিভাগ আরও বেশি বরাদ্দ চাইছে। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাস ও ফার্নেসের দাম বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বিদ্যুৎ খাতের জন্য গ্যাসের দাম বেড়েছে ২০৮ শতাংশ। পাশাপাশি ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের মতো জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নও ব্যয় বাড়াচ্ছে।

গ্যাস খাতে সরকারের ভর্তুকির বড় অংশই যায় এলএনজি আমদানিতে। গত কয়েক বছর ধরে এ খাতে ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও চলতি অর্থবছরে বরাদ্দকৃত ৬ হাজার কোটি টাকার বাইরে আরও প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত প্রয়োজন হতে পারে। এর পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত ও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধিকে কারণ হিসেবে দেখছেন কর্মকর্তারা।

সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়ালেও আপাতত কৃষকদের জন্য সারের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই।

অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে নিম্নআয়ের মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিতে খাদ্য ভর্তুকিও বাড়ানো হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে এ খাতে ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে তা বেড়ে ১০ হাজার ২১৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় প্রণোদনার বরাদ্দ প্রায় ১৩ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ হাজার কোটি টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ বলছেন, ডলারের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় এখন এ ধরনের প্রণোদনার প্রয়োজন আগের তুলনায় কমে এসেছে।

প্রণোদনা চালুর সময় প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৫ টাকা। এখন তা প্রায় ১২২ টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ এ সময়ে টাকার মান কমেছে প্রায় ৩৭ টাকা।

রপ্তানি প্রণোদনায় আগামী অর্থবছরেও ৭ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে, যা চলতি অর্থবছরের সমান। বাংলাদেশ ২০২৬ সালে এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের পর এসব প্রণোদনা ধীরে ধীরে তুলে নেওয়ার কথা ছিল। তবে উত্তরণের সময় তিন বছর পিছিয়ে যাওয়ায় প্রণোদনাও আরও কিছুদিন বহাল থাকবে।

এ ছাড়া পাটজাত পণ্যসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের ভর্তুকি ও প্রণোদনা অব্যাহত থাকবে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, সারের ভর্তুকি কমাতে হলে কৃষকের জন্য সারের দাম বাড়াতে হবে, যা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন সিদ্ধান্ত। তার ওপর বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় ভর্তুকি কমানোর সুযোগও সীমিত হয়ে গেছে।

বিদ্যুৎ ভর্তুকি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা ঘড়ির কাঁটার মতো প্রতিদিনই বাড়তে থাকে। আজ যা দিচ্ছেন, কাল আবার যোগ হচ্ছে। এর মূল কারণ ক্যাপাসিটি চার্জ, যা টিকটিক করা টাইম বোমার মতো।

তার মতে, এই সংকট মোকাবিলায় দুটি পথ আছে—খরচ কমানো অথবা দাম বাড়ানো।

খরচ কমাতে হলে ক্যাপাসিটি চার্জসংক্রান্ত চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু এগুলো আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক হওয়ায় সহজে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, সরকার যদি একতরফাভাবে চুক্তি বাতিল করে, তাহলে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে ক্ষতিপূরণ গুনতে হতে পারে। তাই আলোচনার মাধ্যমে কিংবা চুক্তি প্রক্রিয়ায় অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সেটিকে ভিত্তি করে চুক্তি পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো ও বিতরণ অপচয় কমিয়ে কিছু সাশ্রয় সম্ভব হলেও মোট ব্যয়ের তুলনায় তা খুব বড় নয়।

অন্য বিকল্প হলো বিদ্যুতের দাম বাড়ানো। এতে বছরে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আসতে পারে। তবে এরপরও বড় অঙ্কের ভর্তুকি প্রয়োজন হবে।

রপ্তানি প্রণোদনা প্রসঙ্গে জাহিদ হোসেন বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে এসব প্রণোদনা কমাতে হবে। তবে সরাসরি প্রণোদনা না কমিয়ে উৎসে কর বাড়িয়েও একই ধরনের প্রভাব তৈরি করা সম্ভব।

রেমিট্যান্স প্রণোদনা নিয়ে তিনি বলেন, ডলারের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় এখন প্রণোদনার প্রয়োজন আগের মতো নেই। তবে এটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। প্রণোদনা কমানো হলে অর্থনীতিবিদ ও বিরোধী দলগুলোর সমালোচনার মুখে পড়তে হতে পারে সরকারকে।