সর্বজনীন উৎসবের আকাঙ্ক্ষা
এক মাসের ভেতরে পরপর তিনটি উৎসব। স্বাধীনতা দিবস, বাংলা নববর্ষ আর ঈদ। প্রথম দুটো সর্বজনীন (!), আর শেষটা মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এরকম উৎসবমুখর সময়ে তো দেশজুড়ে আনন্দযজ্ঞ চলার কথা। তা কি হচ্ছে? মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে কী দেখতে পাচ্ছেন আপনারা? বাধভাঙা আনন্দ-উচ্ছ্বাস-উল্লাস-আয়োজন নাকি বিষাদ-বিপন্নতা-হতাশা-হাহাকার?
২১ এপ্রিল ২০২৩, ১২:৫৩ অপরাহ্ন
বিষাদের সেই সুর
জাতীয় সংগীত ছাড়া আর ক’টা সুর আছে পৃথিবীতে যা বেজে উঠলে পুরো জাতি একসঙ্গে সেই সুরে বাঁধা পড়ে যায়? পৃথিবীর অন্য কোথাও এমন সুর আছে কি না আমার জানা নেই, কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে আমাদের আছে। সেটি একুশের গানের সুর, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’র সুর। একুশের প্রথম প্রহরে কিংবা অন্য কোনো সময় যখন এই সুরটি বেজে ওঠে, তখন শ্রেণি-পেশা-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ কিছুক্ষণের জন্য হলেও থমকে দাঁড়ায়, স্তব্ধ হয়ে যায়, তাদের মুখমণ্ডল ছেয়ে যায় এক অদ্ভুত বিষাদে, তাদের মন একবারের জন্য হলেও কেঁদে ওঠে; এমনকি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস জানা না থাকলেও সুরটির কারুকার্য মানুষের মনকে এক অজানা বেদনাবোধে আক্রান্ত করে।
৩ মার্চ ২০২৩, ১০:৪৬ পূর্বাহ্ন
মায়ের মুখের ভাষা
আমাদের বাড়িতে একজন দেহাতি মহিলা ছিল, গৃহকর্মী। তখন অবশ্য গৃহকর্মী শব্দটা চালু হয়নি, আমরা বলতাম - কাজের মানুষ। দীর্ঘদেহী, স্বাস্থ্যবতী, প্রাণবন্ত এবং শক্তিশালী। তার চলাফেরা, কাজকর্ম, কথাবার্তার মধ্যে সেই শক্তিমত্তার প্রকাশও ঘটতো। নিচু কণ্ঠে কথা সে বলতেই পারতো না, ধীরেসুস্থে হাঁটতেও পারতো না, দুপদাপ পা ফেলে প্রায় দৌড়ে চলতো সে। এরকম হাঁটা নিয়েই মা’র আপত্তি ছিল। বলতেন, ‘ও ফুলজান, অত জোরে হাঁটিস না, মাটি ব্যথা পায়।‘
৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৮:১৮ পূর্বাহ্ন
‘তাহাদের’ চোখের ভাষা
বাজারে যাই, যেতেই হয়– কাঁচাবাজারের কথা বলছি – দেখেশুনে নিজের পছন্দমতো জিনিসপত্র কেনার বাতিক আছে আমার, সেজন্য নিজেই বাজার করতে পছন্দ করি। কিন্তু যতবার যাই ততবার নানা কারণে আমার মন খারাপ হয়ে যায়। তার মধ্যে কিছু কারণ একেবারেই অদ্ভুত। জিনিসপত্রের আকাশচুম্বি দাম, সীমিত আয়ের মানুষদের দুর্দশাগ্রস্ত-ক্লান্ত-বিপন্ন-অসহায় মুখ, কিংবা নিজের সামর্থ্যের মধ্যে স্বজনদের পাতে তুলে দেবার মতো ভালো মানের খাদ্যবস্তু কিনতে না পারার অক্ষমতা– এসব কারণে তো বটেই, কিন্তু কিছু অদ্ভুত কারণেও আমার মন খারাপ হয়। এই দুই মন খারাপের ধরন আলাদা।
২১ ডিসেম্বর ২০২২, ০৮:৩৩ পূর্বাহ্ন
মানুষ ভালো নেই
মনে হয়, যেন এক আদিম যুগে ফিরে গেছে দেশ, যখন খাদ্যের সন্ধান ছাড়া মানুষের আর কিছু করার ছিল না। বাজারে গেলে, রাস্তায় বেরুলে মানুষের মুখের দিকে তাকানো যায় না। সেইসব মুখে গভীর বিষাদ ও বিপন্নতা, ক্লান্তি ও হতাশা, বেদনা ও যন্ত্রণা লেপ্টে আছে।
১১ ডিসেম্বর ২০২২, ০১:০৮ অপরাহ্ন
আবু ইসহাক : এক অন্তর্মুখী নিঃসঙ্গ লেখক
অনেকদিন আগের কথা, অন্তত তিরিশ বছর তো হবেই। ছোট্ট একটা ঘরে কয়েকজন তরুণ বসে আছে, অপেক্ষায়। তাদের সবার চোখে ও বুকে লেখক হবার স্বপ্ন। কাজটা সহজ নয়, জানে তারা। জানে এ-ও, খাতার পর খাতা নানারকম লেখা লিখে ভরিয়ে ফেললেও নিজেদের কাছে ছাড়া অন্য কারো কাছে সেগুলোর আদৌ কোনো মূল্য নেই। কয়েক বছরেই তারা নানা জায়গায় ঠেকে ঠেকে শিখে গেছে, এ বড় কঠিন জগৎ। এখানে কেউ কাউকে ছাড় দেয় না। পরিবারের মানুষদের কাছে এসব অহেতুক সময় নষ্ট, বন্ধুদের কাছে আজাইরা আঁতলামি আর যেসব কর্তারা পত্রপত্রিকায় লেখা-টেখা ছাপানোর দায়িত্ব নিয়ে মহামানব হয়ে উঠেছেন, তাদের কাছে এসব লেখাঝোকা যেন নিছকই বালসুলভ চপলতা।
১ নভেম্বর ২০২২, ০৮:৫৭ পূর্বাহ্ন
জীবনের ছন্দ কোথায়
গুন্টার গ্রাসের একটা চমৎকার বই আছে : ‘শো ইওর টাং’ (‘জিভ কাটো লজ্জায়’)। এক বছর কলকাতায় থাকবেন বলে সস্ত্রীক তিনি চলে এসেছিলেন জার্মানি থেকে, কিন্তু সম্ভবত মাস চারেকের মধ্যেই হাঁপিয়ে উঠেছিলেন, ফিরে গিয়েছিলেন নিজ দেশে। এই বই তার কলকাতা-যাপনের অপূর্ব বর্ণনা। তখনও নোবেল পুরস্কার পাননি তিনি, তবু বিশ্ববিখ্যাত লেখক। কলকাতায় থাকার জন্য এবং এই শহরবাসীর জীবন দেখার জন্য তার কৌতূহল এবং আগ্রহ ছিল নিশ্চয়ই, কিন্তু সত্যিই তার সস্ত্রীক চলে আসার ব্যাপারটা নিশ্চয়ই আমাদেরকেও কৌতূহলী করে তোলে। কী দেখতে চেয়েছিলেন তিনি আর কী-ইবা দেখেছেন?
১ অক্টোবর ২০২২, ০৭:৪৪ পূর্বাহ্ন
পৃথিবীর নিঃসঙ্গতম মানুষ
পৃথিবীর নিঃসঙ্গতম মানুষটি মারা গেছেন- এরকম শিরোনামের কোনো খবর দেখলে মনে হওয়ার কথা, বাক্যটি রূপকার্থে বা প্রতীকী অর্থে বলা হয়েছে, যেমনটি বলা হয় কবিতায়। পৃথিবীর সব মানুষই তো কমবেশি নিঃসঙ্গ, কেউ কেউ একটু বেশিই নিঃসঙ্গ, যাদেরকে কেউ বুঝে উঠতে পারে না। সেরকম কেউ মারা গেলেও তো আমাদের এমনই মনে হয়। অথচ খবরের এই শিরোনামটি কোনো রূপকার্থে ব্যবহার করা হয়নি, ব্যবহার করা হয়েছে আক্ষরিক অর্থে। এরকম একজন মানুষ সত্যিই ছিলেন, বাস করতেন ব্রাজিলের আমাজন অরণ্যের গভীরে, সম্পূর্ণ একা। এও কি সম্ভব? একজন মানুষ কীভাবে বনের গভীরে একা বাস করেন, কেনই-বা করেন? একাই কি ছিলেন তিনি সবসময়, জন্ম থেকেই? সেটিই বা কীভাবে সম্ভব? তাকে জন্ম দেবার জন্যও তো অন্তত এক জোড়া নারী-পুরুষ দরকার!
১১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৫:০০ পূর্বাহ্ন
শামসুর রাহমান যেভাবে ‘আমাদের কবি’ হয়ে উঠলেন
তাঁর বাড়িতে কোনো কারণ ছাড়াই অনেকবার গিয়েছি আমি। একা গিয়েছি, বন্ধুদের সঙ্গে দল-বেঁধে গিয়েছি; নিমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছি, আবার বিনা নিমন্ত্রণেও গিয়েছি; সকালে-দুপুরে-বিকেলে এমনকি মধ্যরাতেও তার বাড়িতে হানা দিয়েছি। কোনো সংকোচ ছিল না, দ্বিধা ছিল না। এমন এক পরিবেশ তিনি তৈরি করে রেখেছিলেন যে, তার বাড়িতে যাওয়ার জন্য কেবল ইচ্ছেটুকুই যথেষ্ট ছিল। দুঃসহ ট্রাফিক জ্যাম, শহরময় কালো ধোঁয়া-ধুলো আর যন্ত্রদানবের বিরামহীন বিকট উচ্চ শব্দ- এইসব পেরিয়ে তার বাড়ি গিয়ে পৌঁছালে শরীর ও মনজুড়ে এক ধরনের প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়তো। শ্যামলীর এক নম্বর সড়কে তার ছোট্ট দোতলা বাড়িটি নির্জন-শান্তিময়। আর তার ঠোঁটজুড়ে সারাক্ষণ মৃদু হাসি। যেন সারাদিনই তিনি প্রস্তুত হয়ে থাকতেন চেনা-অচেনা, আমন্ত্রিত-অনাহুত অতিথিদের সাদর সম্ভাষণ জানাতে। তিনি শামসুর রাহমান। আমাদের কবি।
১৭ আগস্ট ২০২২, ০৭:৩৩ পূর্বাহ্ন
মরমী মনের মানুষ
কোনো এক মার্চের সকাল। গ্রামে গেছি বেড়াতে। সকালে, বেলা বাড়ার আগেই, হাঁটতে বেরিয়েছি। শহরের পার্কে কেডস পরে হাঁটার চেয়ে গ্রামের মেঠোপথে ঘাসের ওপর দিয়ে খালি পায়ে হাঁটার আনন্দ বহুগুণ বেশি। ক্যালেন্ডারে যদিও ফাল্গুন মাস, তবু শীতের আমেজ কাটেনি তখনও। শিশিরভেজা ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে দেখি, মৃদু কুয়াশামাখা সেই ভোরে নিজের ফসলি-মাঠের এক প্রান্তে সুদূরে চোখ মেলে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।
১৫ জুলাই ২০২২, ০৪:১৪ অপরাহ্ন
হিরণ্ময় নীরবতা
নীরবতা নিয়ে কথা বলতে গেলে ব্যবহার করতে হয় শব্দ আর সেই শব্দ ভেঙে দেয় নীরবতাকেই। নীরবতার এই ভেঙে পড়া নিয়ে অস্তিত্ববাদী দার্শনিক সোরেন কিয়ের্কেগাদ হয়তো বিচলিত ছিলেন, কারণ, তার ডায়েরির একটি ভূক্তিতে দেখা মেলে এক অদ্ভুত প্রশ্নের, কিংবা বলা যায়, উৎকণ্ঠার। প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি, ঈশ্বরকে নিয়ে একজন মানুষের কি কিছু বলার অধিকার আছে আরেক মানুষকে? কেননা তখন তো টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়বে পরমের সঙ্গে সম্পর্ক, আর সেই সম্পর্কেরই অন্য নাম নীরবতা।
১৭ জুন ২০২২, ০৬:১০ পূর্বাহ্ন
একটি পুরনো বাড়ির গল্প
বাসা বদল করেছি। এটা আসলে কোনো খবরই নয়, এই শহরের ভাড়াটিয়ারা নানা কারণে বাসা বদল করেন, আমিও তার ব্যতিক্রম নই। সেই গল্প বলতেও বসিনি আজ, বলবো অন্য কথা। বলবো, দুটো পুরনো বাড়ির গল্প, সেই সঙ্গে পুরনো দিনের ঢাকা শহরটির কথাও। পড়তে পড়তে হয়তো আপনাদের মনে হবে, এই লেখার শিরোনাম হতে পারে – 'এ শহর যেমন হতে পারতো।'
১৮ মে ২০২২, ০৯:১৭ পূর্বাহ্ন
প্রকৃতির নির্বাচিত জীবনপ্রণালী
কোনো এক সুদূর অতীতে, মানুষ যখন যাযাবর জীবন ছেড়ে বনজঙ্গল কেটে স্থায়ী নিবাস তৈরি করেছিল, তখন কিছু বন্যপ্রাণী এবং পাখি বনের গভীরে সরে না গিয়ে মানুষের সঙ্গেই রয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তাদের এই সিদ্ধান্তের কারণ কী, মাঝে মাঝে তাই ভাবি।
২৪ এপ্রিল ২০২২, ১০:০৮ পূর্বাহ্ন
একজন ইমতিয়াজ মাহমুদ
বহুদিন ধরে বাংলাদেশ এরকম ঘটনা দেখেনি। কী ঘটনা? একজন কবির জন্য গভীর উৎকণ্ঠা আর তীব্র ভালোবাসার ঘটনা। তিনি ইমতিয়াজ মাহমুদ। থাইরয়েড-ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন ইমতিয়াজ, চেন্নাইয়ের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, সার্জারি হবে কালকেই, এই খবরে উৎকণ্ঠিত-উদ্বিগ্ন বাংলাদেশের সাহিত্য-সমাজ। তাঁর জন্য শুভকামনায়, প্রার্থনায়, ভালোবাসায় ভরে উঠেছে ফেসবুক। খবরটা পাওয়ার পর আমি ভেবেছিলাম, উৎকণ্ঠা-দুশ্চিন্তা-উদ্বেগ কেবল আমারই, কিংবা আমার মতো আরো কয়েকজনের যারা ইমতিয়াজকে ভালোবাসেন। কিন্তু অচিরেই ভুল ভাঙলো। অসংখ্য মানুষ লিখলেন তাঁকে নিয়ে, উৎকণ্ঠা আর ভালোবাসার কথা জানালেন, আবেগভরা কথামালা গাঁথলেন, রোগমুক্তির জন্য আকুতি ও প্রার্থনা জানালেন, আরো কত কি!
২ এপ্রিল ২০২২, ০১:০০ অপরাহ্ন
শব্দ নিয়ে ভাবি
শব্দ নিয়ে ভাবি একা একাই। মানুষ তো বিনা কারণে কোনো শব্দ তৈরি করেনি! কোনো একটি শব্দে যখন ভাব প্রকাশকে যথার্থ বলে মনে হয়নি, কিংবা তৃপ্তি মেটেনি, তখন নতুন শব্দের জন্ম অনিবার্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু প্রায় একই অর্থ বহন করে বলে মনে হয় অথচ একই নয়, এরকম একাধিক শব্দের আবিষ্কারের কারণ কী?
২০ মার্চ ২০২২, ০৮:৩৫ পূর্বাহ্ন
কেন লিখি
কেন লিখি, এ প্রশ্নের মুখোমুখি কতবার যে হয়েছি! সৌজন্যবশত উত্তরও দিয়েছি কিছু একটা; কিন্তু সত্যি বলতে কি, আমি ঠিক নিশ্চিত নই যে, কেন লিখি। কখনো মনে হয়, লিখি স্মৃতিপুঞ্জ ধরে রাখবার জন্য। কার স্মৃতি? নিজের? না, কেবল নিজেরই তো নয়। এই যে এতদিন ধরে লিখছি, তিরিশ বছর তো হবেই, গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ-মুক্তগদ্য ইত্যাদি কতকিছু, সব লেখায় তো আমি নিজে উপস্থিত নেই। ভুল বললাম বোধহয়। উপস্থিত আছি বটে, পরোক্ষভাবে আছি, কিন্তু সব স্মৃতি আমার নিজের মালিকানাধীন নয়; বেশিরভাগই এসেছে পর্যবেক্ষণ থেকে, উপলব্ধি থেকে, কল্পনা থেকেও। তার মানে দাঁড়ালো, এ এক সম্মিলিত স্মৃতিপুঞ্জ।
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৪:৫০ পূর্বাহ্ন
অন্য এক ইলিয়াস
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার লেখালেখির প্রথম দিকে ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ শিরোনামে একটি গল্প লিখেছিলেন। একটি অসাধারণ পঙক্তি দিয়ে গল্পটি শুরু হয়। ‘এই মনোরম মনোটোনাস শহরে অনেকদিন পর আজ সুন্দর বৃষ্টি হলো।’
৪ জানুয়ারি ২০২২, ০৯:৪৬ পূর্বাহ্ন