দীর্ঘমেয়াদে ভালো বাজেট হলো কি না—কীভাবে বুঝবেন?
অর্থনীতির হিসাব-নিকাশের মারপ্যাঁচ কজনই বা বুঝি। খবরের কাগজে বা টেলিভিশনে সরকারের নতুন বাজেট নিয়ে আলোচনায় কোটি কোটি টাকার অঙ্ক আর জটিল তত্ত্ব মাথায় ঢুকতেই চায় না যেন।
জাতীয় বাজেট মূলত সরকারের আয়-ব্যয় ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার একটি বার্ষিক নকশা। বাজেট আগামী এক বছর আপনার-আমার জীবন কেমন কাটবে, তার একটা আগাম হিসাবও বলতে পারেন। অর্থনীতির ডিগ্রি না থাকলেও একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আপনি নিজেই মূল্যায়ন করতে পারবেন এই বাজেটটি আপনার-আমার জন্য কতটা ভালো হলো।
একটি বাজেট দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হলো—তা বুঝতে কিছু বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখতে পারেন। সেগুলোই বোঝার চেষ্টা করা যাক।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বরাদ্দ বাড়ছে কি না
যেকোনো দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ। তাই একটা ভালো বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কতটা বাড়ানো হলো, সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বব্যাংক ও ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, যেসব দেশ দীর্ঘমেয়াদে উন্নত হয়েছে, তারা শিক্ষা খাতে বড় বিনিয়োগ করেছিল। যেমন দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর বা ফিনল্যান্ড।
দক্ষিণ কোরিয়া ষাটের দশকে দরিদ্র দেশ ছিল। কিন্তু তারা তাদের বাজেটে ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল’ বা মানবসম্পদ উন্নয়নে রেকর্ড পরিমাণ বরাদ্দ দেয়। তারা প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করে। ফলে দেশটি এখন বিশ্বের অন্যতম শিল্পোন্নত অর্থনীতি।
সিঙ্গাপুর ও ফিনল্যান্ডের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। প্রাকৃতিক সম্পদ না থাকা সত্ত্বেও শুধু মানসম্মত শিক্ষার জোরে তারা আজ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী দেশ।
একটি ভালো বাজেটে সাধারণত নতুন স্কুল-কলেজ নির্মাণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ, কারিগরি ও প্রযুক্তি শিক্ষার বিস্তার, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বরাদ্দ এবং ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো হয়।
শিক্ষায় বিনিয়োগের ফল তাৎক্ষণিক পাওয়া যায় না। কিন্তু পাঁচ-দশ বছর পর এই শিক্ষার্থীরাই দক্ষ শ্রমশক্তিতে পরিণত হয় এবং দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়ায়।
একইভাবে স্বাস্থ্য খাতও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে প্রতি বছর চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে বহু পরিবার দরিদ্র হয়ে পড়ে। তাই একটি মানবিক বাজেটে সরকারি হাসপাতালের মানোন্নয়ন, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সুবিধা বাড়ানো, নতুন ডাক্তার ও নার্স নিয়োগ, কম খরচে ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোভিড-১৯ মহামারির সময় যেসব দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী ছিল, তারা তুলনামূলক ভালোভাবে সংকট মোকাবিলা করতে পেরেছিল।
যেমন ওই সময় জার্মানির ‘ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ’ (সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা) এবং জাপানের শক্তিশালী আইসিইউ ও জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছিল। এই দেশগুলোতে চিকিৎসার সিংহভাগ খরচ রাষ্ট্র বহন করে। ফলে নাগরিকরা হঠাৎ করে দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েননি।
একটি বাজেট দেশের মানুষের জন্য কতটা করতে পারবে, তা নির্ভর করে বাজেটের আকারের ওপর। আর এই আকারটি নির্ধারিত হয় দেশের মোট অর্থনীতি বা জিডিপির তুলনায় তার অনুপাত কত, তার ওপর।
২০২৪ সালের হিসাবে বাংলাদেশের জিডিপির আকার ছিল প্রায় ৪৫০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বা ৪৫ হাজার ৫০ কোটি ডলার। একই বছরে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
একটি বাজেট কতটা কার্যকর ও শক্তিশালী হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে সরকারের নিজস্ব আয় বা রাজস্বের ওপর। যে দেশে কর আদায়ের সক্ষমতা বেশি, সেই দেশের সরকারের ব্যয় করার সক্ষমতাও বেশি হয়।
উন্নত দেশগুলোতে কর-জিডিপি অনুপাত তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি হওয়ায় তাদের সরকারি ব্যয়ের পরিমাণও বড়। যেমন ফ্রান্সে সরকারি ব্যয় জিডিপির প্রায় ৫৩ থেকে ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ, দেশটির মোট অর্থনীতির অর্ধেকেরও বেশি সম্পদ সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় করতে পারে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৫ থেকে ২ শতাংশের আশেপাশে। অথচ ইউনেস্কোর মতে, শিক্ষা খাতে জিডিপির অন্তত ৪ থেকে ৬ শতাংশ ব্যয় করা প্রয়োজন। একইভাবে স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের সরকারি বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশেরও নিচে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানদণ্ড অনুযায়ী, কার্যকর জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে এ খাতে জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ ব্যয় প্রয়োজন বলে ধরা হয়।
বাজেট কর্মসংস্থান তৈরি করছে কি না
কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেই বাজেট ভালো হয় না। সাধারণ মানুষের কাজের সুযোগ যেন বাড়ে, তা-ও বিবেচনায় রাখতে হয়। একটি কার্যকর বাজেটে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্পষ্ট পরিকল্পনা থাকে।
বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠী বেশি, এমন দেশে কর্মসংস্থান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ চাকরির বাজারে ঢোকেন। তাদের জন্য নতুন শিল্প, কারখানা, আইটি খাত, কৃষিভিত্তিক শিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করতে হয়।
ভালো বাজেটে সাধারণত নতুন বিনিয়োগে কর ছাড়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ ঋণ, স্টার্টআপ ও প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসায় সহায়তা, রপ্তানিমুখী শিল্পে প্রণোদনা, নারীদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ থাকে।
ভিয়েতনামের কথাই ধরুন। দেশটি গত দুই-তিন দশকে শিল্প ও রপ্তানিমুখী বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত সুবিধা দিয়েছে। ফলে স্যামসাং, অ্যাপলের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠাগুলো ভিয়েতনামে কারখানা করেছে। এতে করে সেখানে বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে ও দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
যদি বাজেটে শুধু বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প থাকে কিন্তু কর্মসংস্থানের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষের জীবনে এর সুফল কমই মিলবে।
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কতটা শক্তিশালী হচ্ছে
একটি ভালো বাজেট সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষদেরও সুরক্ষা দেয়। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য সহায়তা, মাতৃত্বকালীন সহায়তা—এসবই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অংশ।
যদি বাজেটে ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হয়, নতুন মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা বাড়ানো হয়, তাহলে ধরে নেওয়া যায় বাজেটটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক।
উদাহরণ হিসেবে ব্রাজিলের ‘বলসা ফ্যামিলিয়া’ কর্মসূচির কথা বলা যায়। ২০০৩ সালে ব্রাজিলের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা এই কর্মসূচি চালু করেন।
দেশটির এই নগদ অর্থ সহায়তার শর্ত ছিল—গরিব পরিবারগুলো টাকা পাবে, কিন্তু তাদের সন্তানদের অবশ্যই স্কুলে পাঠাতে হবে এবং নিয়ম করে টিকা দিতে হবে। এই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দেশটিতে দারিদ্র্য ও অপুষ্টি কমাতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘমেয়াদে কেন এসব গুরুত্বপূর্ণ
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতগুলোতে বিনিয়োগের সুফল তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যায় না। কিন্তু এগুলোই একটি দেশের ভবিষ্যৎ শক্ত ভিত্তি তৈরি করে।
শিক্ষায় বিনিয়োগ আগামী দশকে দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর জনগোষ্ঠী তৈরি করে। স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ মানুষের কর্মক্ষমতা ও গড় আয়ু বাড়ায়। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি মানুষের আয় বাড়ায় ও দারিদ্র্য কমায়। সামাজিক নিরাপত্তা বৈষম্য কমাতে সহায়তা করে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে দেশ অর্থনৈতিকভাবে আরও স্থিতিশীল, উৎপাদনশীল ও স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে।
তবে বাজেটে বরাদ্দ বাড়ালেই সব সমস্যার সমাধান হবে-এমন না। বাংলাদেশে অনেক সময় বরাদ্দ দেওয়া টাকা পুরোপুরি খরচ হয় না, প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হয় এবং দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। তাই শুধু বড় অঙ্ক নয়, বাস্তবায়নের মান, দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও দেখতে হবে।